,

বৈশ্বিক ব্যাংকিংয়ে আবারও বাড়ছে বিদেশমুখী আগ্রহ

দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক ব্যবসা সীমিত রাখার পর বিশ্বের বড় ব্যাংকগুলো আবারও দেশের সীমানা পেরিয়ে কার্যক্রম সম্প্রসারণের দিকে ঝুঁকছে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর অতিরিক্ত ঝুঁকি, পরিচালন ব্যয় এবং বিনিয়োগকারীদের চাপের কারণে অনেক ব্যাংক বিদেশি বাজার থেকে সরে এসে নিজ নিজ দেশের ব্যবসায় মনোযোগ দিয়েছিল। এখন সেই কৌশলে ধীরে ধীরে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

রয়টার্সের ‘ভিউজরুম’ পডকাস্টের সাম্প্রতিক আলোচনায় আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়ের এই পরিবর্তন উঠে এসেছে। আলোচনায় বলা হয়, বিশ্বের বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নতুন করে বিদেশি বাজারে প্রবেশ, অংশীদারত্ব এবং বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়ছে। Banco Santander এবং JPMorgan Chase-এর মতো প্রতিষ্ঠান নিজেদের আন্তর্জাতিক উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিচ্ছে।

২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়ের বিস্তৃত মডেল নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা তৈরি হয়েছিল। সে সময় অনেক ব্যাংক বিদেশে থাকা শাখা, সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা বিক্রি করে নিজেদের মূল বাজারে ফিরে যায়। Citigroup এবং HSBC-এর মতো বড় আন্তর্জাতিক ব্যাংকও তাদের বৈশ্বিক কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস করে। বিপুল সংখ্যক দেশে উপস্থিতি ধরে রাখা ব্যাংকগুলোর জটিল কাঠামোও অনেক ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণ হারায়।

বর্তমানে সেই পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। আন্তর্জাতিকভাবে বিস্তৃত ব্যাংকগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগের নেতিবাচক মনোভাব কিছুটা নরম হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা নতুন বাজারে প্রবেশ, বিদেশি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ এবং সীমান্তপারের ব্যবসা বাড়ানোর ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি সুযোগ পাচ্ছে।

জেপিমরগ্যানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই ব্যাংক যুক্তরাজ্য ও জার্মানির খুচরা ব্যাংকিং বাজারে নিজেদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। ইউরোপের বাইরে ফরাসি ব্যাংক BNP Paribas ভিয়েতনামের টেককমব্যাংকে অংশীদারত্ব নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাজ্যের NatWest Group যুক্তরাষ্ট্রে একটি প্রতিনিধি কার্যালয় খোলার অনুমোদন পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক ঋণবাজারের পরিসংখ্যানও ব্যাংকগুলোর নতুন করে বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে সীমান্তপারের ব্যাংক ঋণ এক বছরের তুলনায় ১১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের আগের সময়ের পর এটি সীমান্তপারের ব্যাংক ঋণে সবচেয়ে শক্তিশালী বৃদ্ধিগুলোর একটি।

ব্যাংকগুলোর কাছে আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণের প্রধান আকর্ষণ হলো নতুন গ্রাহক ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ। বিদেশি বাজারে ঋণ বিতরণ বাড়াতে পারলে ব্যাংকগুলোর সুদ আয় ও অন্যান্য ব্যবসায়িক আয়ের ক্ষেত্রও বিস্তৃত হতে পারে। পাশাপাশি একাধিক দেশে কার্যক্রম থাকলে কোনো একটি দেশের অর্থনৈতিক দুর্বলতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।

তবে বিদেশে ব্যবসা বাড়ানোর সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ে। বিভিন্ন দেশের মুদ্রার ওঠানামা, ভিন্ন ভিন্ন নিয়ন্ত্রক কাঠামো, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। একটি দেশে সফল ব্যবসায়িক মডেল অন্য দেশে একইভাবে কাজ নাও করতে পারে। স্থানীয় বাজারের প্রতিযোগিতা, গ্রাহকের আচরণ এবং সরকারি নীতিও ব্যাংকের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে।

২০০৮ সালের অভিজ্ঞতা তাই এখনও গুরুত্বপূর্ণ। সেই সংকটের আগে অনেক আন্তর্জাতিক ব্যাংক দ্রুত সম্প্রসারণের পাশাপাশি জটিল আন্তঃদেশীয় আর্থিক কার্যক্রম বাড়িয়েছিল। সংকটের সময় এসব আন্তঃসংযোগ আর্থিক ঝুঁকি ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে। ফলে এবার ব্যাংকগুলো বিদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে মূলধন, নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে কতটা গুরুত্ব দেয়, সেটিই হবে বড় বিষয়।

আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়ের এই পুনরুত্থান শুধু কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। এর সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মূলধনের প্রবাহ, বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের পরিবর্তনও জড়িত। নতুন বাজারে একীভবন ও অধিগ্রহণের প্রবণতা বাড়লে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং খাত আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।

তবে এই প্রবৃদ্ধি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে ব্যাংকগুলো কতটা সতর্কতার সঙ্গে নতুন বাজারে প্রবেশ করে তার ওপর। প্রবৃদ্ধির সুযোগ কাজে লাগানোর পাশাপাশি ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ ব্যাংকগুলোর জন্য নতুন আয়ের পথ খুলে দিতে পারে। আর অতিরিক্ত দ্রুত সম্প্রসারণ হলে এক যুগ আগে দেখা সমস্যাগুলোর কিছু আবারও সামনে আসার আশঙ্কা থাকবে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।