মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক ও সামুদ্রিক অবরোধকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল বিক্রিতে বড় সাফল্য দেখিয়েছে ইরান। চলতি ফার্সি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (মার্চ থেকে জুলাই) অপরিশোধিত তেল বিক্রি থেকে অর্জিত ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার সরাসরি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা করেছে দেশটি। শনিবার ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘ফার্স’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য জনসমক্ষে আনা হয়।
ইরানের জ্বালানি তেল মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি রপ্তানি করে পাওয়া এই বিপুল অর্থ দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার তহবিলকে বেশ চাঙ্গা করেছে। মূলত চলতি বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রায় পরিচালিত বিভিন্ন কেনাকাটা, নিত্যপণ্য আমদানি ও বৈদেশীক দায় পরিশোধে এই অর্থ সরাসরি ব্যয় করা হবে। মার্কিন প্রশাসন আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় নজরদারি ও বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল বাধাগ্রস্ত করার নানামুখী পদক্ষেপ নিলেও জাতীয় বাজেটের নির্ধারিত আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ইরান কোনো বাধার মুখে পড়েনি বলে তেল মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে।
বর্তমানে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও আঞ্চলিক উত্তেজনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে কৌশলগত সামুদ্রিক পথ ‘হরমুজ প্রণালি’। সারা বিশ্বে ব্যবহৃত মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বা ২০ শতাংশই এই সরু ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পানিপথ দিয়ে বিভিন্ন দেশে পরিবাহিত হয়। তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইরান এই প্রণালি দিয়ে বিদেশি ও প্রতিপক্ষ দেশের জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে রেখেছে। বিপরীতে, ওয়াশিংটন ও তার পশ্চিমা মিত্র জোট অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অবাধ নৌ চলাচলের সুযোগ দেওয়ার জোর দাবি জানিয়ে আসছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিহার ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে গত জুন মাসে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির বিশেষ কোনো উন্নতি ঘটেনি। তেহরানের উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা স্পষ্ট বার্তা দিয়ে জানিয়েছেন যে, মার্কিন সরকার সেই সমঝোতা স্মারকের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত তারা হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে কড়াকড়ি তুলবে না। ইরানের উপস্থাপিত প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো— সমুদ্রপথের সব ধরনের নৌ অবরোধ ও নজরদারি তুলে নেওয়া, আন্তর্জাতিক ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের তহবিল ছাড় করা এবং সার্বিক বাণিজ্য ও অর্থনীতির ওপর থেকে সমস্ত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বাতিল করা।
নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশের ভেতরে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক চাপ ও কঠিন বাস্তবতা নিয়ে লুকোচুরি করেননি ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার কোনো ক্ষতিকর প্রভাব দেশে পড়ছে না বলে যারা দাবি করেন, তাদের বাস্তব জ্ঞান নিয়ে কিছু বলার ভাষা আমার জানা নেই। আমাদের বুঝতে হবে যে একটি পুরোদস্তুর যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও কঠিন বাস্তবতা মাথায় রেখেই আমাদের টিকে থাকার পথ বের করতে হবে।’
একই বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তেহরানের গভর্নর মোহাম্মদ সাদেক মোতামেদিয়ান উল্লেখ করেন, চলমান সংঘাত আর কঠোর সামুদ্রিক বাধার মুখে দেশ চালাতে গিয়ে ইরানকে অভূতপূর্ব এক সংকটের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তবে সব প্রতিবন্ধকতা পাশ কাটিয়ে অত্যন্ত সতর্ক কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক কৌশলে তেল রপ্তানি সচল রেখে দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের এই প্রভাবশালী দেশটি।









