জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

পানি, বিদ্যুৎ ও সাইবার নিরাপত্তায় বুয়েটের নতুন উদ্যোগ

গঙ্গার পানি বণ্টন, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতা এবং সাইবার নিরাপত্তা—বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই তিনটি খাতে নীতিগত আলোচনা থেকে বাস্তব কর্মপরিকল্পনার দিকে এগোতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। ‘ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপ্লোম্যাসি’ বা প্রকৌশলভিত্তিক কূটনীতির একটি কাঠামোর মাধ্যমে জটিল জাতীয় ও আঞ্চলিক সমস্যার সমাধানে তথ্য, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর স্বার্থ এবং বাস্তবায়নের সুযোগকে একসঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এই উদ্যোগের আওতায় আগামী ৯০ দিনের মধ্যে কোন কাজগুলো করা সম্ভব, প্রয়োজনীয় তথ্য কোথা থেকে সংগ্রহ করতে হবে, কোন প্রতিষ্ঠান বা পক্ষের সঙ্গে আলোচনা জরুরি এবং সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কী ধরনের সক্ষমতা প্রয়োজন—এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

বুয়েটের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট এবং যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস ইউনিভার্সিটির যৌথ উদ্যোগে ২৫ থেকে ২৭ আগস্ট ঢাকায় অনুষ্ঠিত তিন দিনের ‘ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপ্লোম্যাসি ওয়ার্কশপ ২০২৬’-এ এসব কর্মপথ নিয়ে কাজ করা হয়। কর্মশালায় সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত, নাগরিক সমাজ, উন্নয়ন সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। উদ্যোগটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের প্রাথমিক সহায়তাও ছিল।

পানি বিদ্যুৎ ও সাইবার নিরাপত্তায় বুয়েটের নতুন উদ্যোগ পানি, বিদ্যুৎ ও সাইবার নিরাপত্তায় বুয়েটের নতুন উদ্যোগ

আয়োজকদের মতে, প্রচলিত নীতিগত আলোচনার সঙ্গে এই উদ্যোগের পার্থক্য হলো—এখানে শুধু সমস্যা চিহ্নিত করে সুপারিশ দেওয়াই লক্ষ্য নয়। বরং একটি সমস্যার পেছনে থাকা তথ্য, কারিগরি সীমাবদ্ধতা, বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সম্ভাব্য পথ একসঙ্গে বিবেচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়েছে।

গঙ্গার পানি বণ্টনে তথ্যনির্ভর প্রস্তুতির ওপর জোর

গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন বাংলাদেশের আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনা ও কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কর্মশালায় এই আলোচনাকে আরও শক্তিশালী করতে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও পরিমাপযোগ্য সূচকের ভিত্তিতে বাংলাদেশের প্রয়োজন নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আলোচনায় প্রয়োজন ও সূচকভিত্তিক ন্যূনতম নিশ্চিত পানি প্রবাহের ধারণা খতিয়ে দেখার কথা উঠে এসেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নদীর পানি প্রবাহ বাড়ানোর সম্ভাব্য উদ্যোগ নিয়েও ভাবা হয়েছে।

তবে এ ধরনের উদ্যোগের আগে বাংলাদেশের পানির প্রকৃত চাহিদা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কৃষি, শিল্প, পরিবেশ ও জনজীবনে পানির প্রয়োজনের পাশাপাশি নদীর প্রবাহে মৌসুমি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন, ফারাক্কা অঞ্চলে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় প্রবাহ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য একত্র করা জরুরি। তাই আগামী ৯০ দিনের কর্মসূচিতে বিভিন্ন গবেষণা ও তথ্যসূত্র সমন্বয় এবং সম্ভাব্য আলোচনায় ভারতের অবস্থান বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পানি, বিদ্যুৎ ও সাইবার নিরাপত্তায় বুয়েটের নতুন উদ্যোগ
পানি, বিদ্যুৎ ও সাইবার নিরাপত্তায় বুয়েটের নতুন উদ্যোগ

তথ্যনির্ভর প্রস্তুতির গুরুত্ব এখানেই। আলোচনার টেবিলে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও পরিমাপযোগ্য প্রয়োজন উপস্থাপন করা গেলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুসংহতভাবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিদ্যুৎ সহযোগিতায় বিকল্প সংযোগের অনুসন্ধান

বিদ্যুৎ খাতেও আঞ্চলিক সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ গ্রিডের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টি কর্মশালায় গুরুত্ব পেয়েছে।

বর্তমানে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতায় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংযোগ রয়েছে। তবে একটি মাত্র প্রবেশপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ভবিষ্যতে বিকল্প সংযোগ তৈরি করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখার প্রস্তাব এসেছে। এর মধ্যে মিয়ানমার হয়ে পূর্বাঞ্চলীয় সংযোগ এবং বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ সহযোগিতার সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট নয়। জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদা, আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ প্রবাহ, তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা এবং গ্রিডের কারিগরি সক্ষমতা সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য প্রয়োজন। সে কারণে ৯০ দিনের কর্মসূচিতে জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদা ও তথ্য বিনিময় নিয়ে সমীক্ষা, আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্যের জন্য গ্রিডবিষয়ক নীতিমালা ও কারিগরি মান সমন্বয়ের উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি চুক্তি সম্পাদনে বাংলাদেশের আইনগত ও ক্রয়সংক্রান্ত সক্ষমতা পর্যালোচনার বিষয় রাখা হয়েছে।

সাইবার নিরাপত্তায় দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা

সাইবার নিরাপত্তা খাতে বাংলাদেশের স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও নতুন প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগগুলোর সম্ভাবনা থাকলেও বাজারে আস্থা তৈরি এবং পণ্যের কার্যকারিতা যাচাই এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। কর্মশালায় এই আস্থার ঘাটতি কাটাতে ব্যাংক, সাইবার নিরাপত্তা উদ্যোগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সহযোগিতার একটি কাঠামো তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সাইবার নিরাপত্তা পণ্যের মান, কার্যকারিতা ও নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে কোনো দেশীয় পণ্য বা সেবা গ্রহণের আগে প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে তার সক্ষমতা যাচাই করতে পারবে।

একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো বড় ক্রেতা বা ‘অ্যাঙ্কর পার্টনার’ তৈরি করে দেশীয় সাইবার নিরাপত্তা সমাধানের বাজার গড়ে তোলার পরিকল্পনাও আলোচনায় এসেছে। এর লক্ষ্য কেবল বিদেশি প্রযুক্তির বিকল্প তৈরি করা নয়; বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা চাহিদা ও বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সুযোগ বাড়ানো।

ছয় ধাপে সমস্যা সমাধানের কাঠামো

‘ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপ্লোম্যাসি’র মূল ধারণাটি হলো, জটিল নীতিগত সমস্যাকে প্রকৌশলভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য সিদ্ধান্তে রূপ দেওয়া। কর্মশালায় এ জন্য ছয় ধাপের একটি কাঠামো অনুসরণ করা হয়েছে।

প্রথমে সমস্যা নির্ণয়, এরপর বিদ্যমান পরিস্থিতি ও সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাব্য পথ নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া ও উপকরণ চিহ্নিতকরণ, ফলাফল পরিমাপ এবং সর্বশেষে বাস্তবায়নযোগ্যতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

এই পদ্ধতিতে একই তথ্য বিভিন্ন পক্ষ কেন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে, পরিবর্তন আনার সবচেয়ে কার্যকর জায়গা কোনটি এবং প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে কী ধরনের নতুন সমাধান তৈরি করা সম্ভব—এসব প্রশ্নও সামনে রাখা হয়েছে।

বুয়েটের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগস্টের এই কর্মশালা একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বুয়েটের নেতৃত্বে একটি স্থায়ী ‘ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপ্লোম্যাসি’ কেন্দ্র গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। সম্ভাব্য এই কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ, প্রয়োগভিত্তিক গবেষণা, নিয়মিত কর্মশালা এবং সরকারি ও শিল্পখাতকে নীতিগত ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত উদ্যোগটির কার্যকারিতা নির্ভর করবে কর্মশালায় তৈরি ধারণাগুলো বাস্তব নীতি ও সিদ্ধান্তে কতটা রূপ নেয় তার ওপর। আগামী ৯০ দিনের কর্মসূচি সেই বাস্তব পরীক্ষার প্রথম ধাপ। পানি, বিদ্যুৎ ও সাইবার নিরাপত্তার মতো কৌশলগত ক্ষেত্রে নির্ধারিত পদক্ষেপগুলো যদি পরিমাপযোগ্য ফলাফল তৈরি করতে পারে, তাহলে প্রকৌশল, তথ্য ও কূটনীতিকে একত্র করে নীতি প্রণয়নের একটি নতুন মডেল হিসেবে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপ্লোম্যাসি’ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ পেতে পারে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর