নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকার আমিনবাজারে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে প্রকল্প নিয়ে আগামী ২ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার কথা, তার মূল বিদ্যুৎ ক্রয়দর নতুন নয়। প্রায় সাড়ে চার বছর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে একই চীনা কোম্পানির সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছিল, সেখানেও প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ধরা হয়েছিল শূণ্য দশমিক ২১ ডলার, যা ডলারের বিনিময় হার অনুযায়ী প্রতি ইউনিটের দাম পড়ত ১৮ টাকার কিছু বেশি।
এখন একই ডলারভিত্তিক দর, একই ধরনের প্রকল্প এবং প্রায় একই শর্তে বিদ্যুতের দাম টাকায় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২৫ টাকা।
এর আগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আমিনবাজারে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের জন্য চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের (সিএমইসি) সঙ্গে চুক্তি করে সরকার।
ওই সময় বিদ্যুৎ কেনার জন্য বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট বা পিপিএও হয়। ‘নো ইলেকট্রিসিটি, নো পেমেন্ট’ ভিত্তিতে করা ওই চুক্তিতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ধরা হয়েছিল প্রায় শূণ্য দশমিক ২১ ডলার।
তৎকালীন ডলার-টাকার বিনিময় হার অনুযায়ী এই দাম ছিল প্রতি ইউনিট ১৮ টাকার কিছু বেশি।
প্রকল্পের আওতায় সিএমইসি নিজস্ব অর্থায়নে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, নির্দিষ্ট অবকাঠামো তৈরি এবং পরিবেশগত মানদণ্ড মেনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কথা ছিল। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব ছিল জমি দেওয়া এবং প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সরবরাহ করা।
কিন্তু কয়েক বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও প্রকল্পটি বিদ্যুৎ উৎপাদনে যায়নি। এখন প্রকল্পটি চালু করার নতুন সময়সীমা সামনে এনে একই ডলারভিত্তিক দরে চূড়ান্ত চুক্তির প্রস্তুতি চলছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, আমিনবাজারের ল্যান্ডফিলে চীনা কোম্পানির প্রকল্প থেকে আগামী দেড় বছরের মধ্যে প্রায় ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। সরকার এই বিদ্যুৎ কিনবে প্রতি ইউনিট প্রায় ২৫ টাকা দরে।
অর্থাৎ, ডলারে দাম কার্যত অপরিবর্তিত থাকলেও টাকায় বিদ্যুতের দাম বেড়েছে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ।
সাড়ে চার বছরে প্রকল্প এগোল কতটা?
২০২১ সালের ডিসেম্বরে চুক্তির পর প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের কথা থাকলেও এখনো বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়নি। বরং ২০২৬ সালে এসে নতুন করে চূড়ান্ত অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন চুক্তির কথা বলা হচ্ছে।
এই দীর্ঘ সময়ের বিলম্বের কারণে ডলারের বিপরীতে টাকার বড় অবমূল্যায়ন হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ কেনার টাকার অঙ্কে।
এখানে আরেকটি প্রশ্ন উঠছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব যদি বিনিয়োগকারী বা প্রকল্প ব্যবস্থাপনার কারণে হয়ে থাকে, তাহলে সেই বিলম্বের ফলে সৃষ্ট বাড়তি বিনিময় হারজনিত ব্যয় কি পুরোপুরি বাংলাদেশের ভোক্তা ও সরকারের বহন করা যৌক্তিক?
আবার প্রকল্পের শর্ত অপরিবর্তিত থাকলে চুক্তির সময় পুনঃআলোচনার মাধ্যমে ট্যারিফ কমানোর সুযোগ ছিল কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।
কারণ ২০২১ সালের পর বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় পরিবর্তন এসেছে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বিশেষায়িত প্রযুক্তিনির্ভর হলেও প্রকল্পের নতুন বাস্তবতা বিবেচনায় দর পুনর্নির্ধারণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।
২৫ টাকার বিদ্যুৎ, কিন্তু সরকার বলছে লাভ অন্য জায়গায়
প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা বিদ্যুতের দাম শুনতে ব্যয়বহুল মনে হলেও সরকারের যুক্তি ভিন্ন।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, এই প্রকল্পে সরকারকে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সরাসরি বিনিয়োগ করতে হচ্ছে না। চীনা কোম্পানি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করবে, ল্যান্ডফিল ব্যবহার করবে এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবেশগত সুবিধাও তৈরি হবে।
সরকারের যুক্তি হলো, ঢাকা শহরের বিপুল পরিমাণ বর্জ্য এখন একটি বড় সমস্যা। সেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আলাদা খরচও রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পটি বর্জ্যের পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতে এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থাৎ শুধু প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম দিয়ে প্রকল্পের লাভ-ক্ষতি হিসাব করা যাবে না। বর্জ্য অপসারণ, ল্যান্ডফিল ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ দূষণ এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর আর্থিক সুবিধাও হিসাবের মধ্যে আনতে হবে।
এই যুক্তি আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছিলেন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্মার্ট শহর গঠনে ভূমিকা রাখবে এবং গ্রিনহাউস গ্যাস কমিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহায়তা করবে।
তাহলে দর কমল না কেন?
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ২০২১ সালে প্রতি ইউনিট শূণ্য দশমিক ২১ ডলার ধরে যে প্রকল্পের চুক্তি হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসেও প্রায় একই ডলারভিত্তিক দরে চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি চলছে।
কিন্তু এই সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি। বাংলাদেশে ডলারের দাম বেড়েছে, টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে এবং সেই চাপ গিয়ে পড়েছে বিদ্যুতের টাকায়।
সরকার এখন বলছে, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি ব্যয়বহুল। প্রকল্পে পরিবেশগত সুবিধাও রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব সুবিধা তো ২০২১ সালেও ছিল। তাহলে সাড়ে চার বছর পর একই শর্তে নতুন চুক্তির সময় বিদ্যুতের ডলারভিত্তিক দাম কমানোর বিষয়ে আলোচনার প্রয়োজন ছিল না কেন?
বিশেষ করে সরকার যখন একদিকে বিদ্যুৎ খাতে উচ্চমূল্যের চুক্তি পর্যালোচনা ও ব্যয় কমানোর কথা বলছে, তখন পুরোনো দরে নতুন করে চুক্তি করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
‘নো ইলেকট্রিসিটি, নো পেমেন্ট’, তবু ঝুঁকি কার!
চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলে কোনো অর্থ দেওয়া হবে না। অর্থাৎ কেন্দ্র উৎপাদনে যাওয়ার আগে সরকারকে বিদ্যুতের বিল দিতে হবে না।
তবে কেন্দ্র উৎপাদনে যাওয়ার পর প্রতি ইউনিটের দাম নির্ধারিত হবে ডলারে। ফলে ভবিষ্যতে টাকার আরও অবমূল্যায়ন হলে বিদ্যুতের টাকাভিত্তিক দাম আরও বাড়তে পারে।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার। বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং কোম্পানির বিনিয়োগের ঝুঁকির বাইরে মুদ্রার অবমূল্যায়নের পুরো চাপ শেষ পর্যন্ত বিদ্যুতের ক্রেতা হিসেবে সরকারকেই বহন করতে হবে।
সরকারের বিদ্যুৎ কেনার অর্থ শেষ পর্যন্ত আসে রাষ্ট্রীয় কোষাগার, ভর্তুকি এবং ভোক্তার কাছ থেকে আদায় করা অর্থ থেকে। ফলে ডলারের দর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই চুক্তির আর্থিক চাপও বাড়বে।
পরিবেশের সুবিধা কি ২৫ টাকার দামকে যৌক্তিক করে: বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পকে শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে দেখলে প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা অত্যন্ত বেশি বলে মনে হতে পারে। কিন্তু প্রকল্পটির আরেকটি দিক হলো, এটি প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যবহার করা হবে।
আমিনবাজারের ল্যান্ডফিলে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টন বর্জ্য সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এই বর্জ্যের একটি বড় অংশ যদি বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা যায়, তাহলে ল্যান্ডফিলের ওপর চাপ কমতে পারে।
তবে পরিবেশগত সুবিধার আর্থিক মূল্য কত, প্রকল্পের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সরকারের কত অর্থ সাশ্রয় হবে এবং সেই সাশ্রয় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের অতিরিক্ত দামের সঙ্গে কতটা সমন্বয় করবে, তার একটি স্বচ্ছ হিসাব প্রয়োজন।
কারণ প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা দিয়ে বিদ্যুৎ কিনে পরিবেশগত সুবিধার কথা বললেই প্রকল্পটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাশ্রয়ী হয়ে যায় না। প্রকল্পের পুরো জীবনচক্র, বর্জ্য পরিবহন ব্যয়, ল্যান্ডফিল ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত লাভ এবং বিদ্যুৎ ক্রয়ের মোট ব্যয় একসঙ্গে বিবেচনা করেই এর প্রকৃত অর্থনৈতিক চিত্র পাওয়া সম্ভব।








