বরিশাল নগরীতে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। দিন-রাত মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ বার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় একবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার সময় এক ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত গড়াচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় লাখ গ্রাহকের এই নগরীতে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১০০ মেগাওয়াট। বিপরীতে বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে এর প্রায় অর্ধেক। অর্থাৎ চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতি সামাল দিতে বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বাসিন্দাদের ভাষ্য, জুলাইয়ের শুরু থেকেই নগরীতে লোডশেডিংয়ের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দিনের কর্মব্যস্ত সময় থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি ছাড়াই বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ফলে জরুরি কাজ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন গৃহস্থালির কর্মকাণ্ডেও তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা।
Table of Contents
গরমে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি শিশু-বয়স্কদের
বিদ্যুৎহীনতার কারণে প্রচণ্ড গরমে সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছেন শিশু ও বয়স্করা। ঘরে বৈদ্যুতিক পাখা চালানো সম্ভব না হওয়ায় অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের দীর্ঘ লোডশেডিং ঘুমের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। অনেক পরিবারকে শিশুদের নিয়ে অস্বস্তিকর পরিবেশে রাত কাটাতে হচ্ছে।
গভীর রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে। ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর অনেকেই বিদ্যুৎ ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকছেন। ভোর পর্যন্ত বিদ্যুৎ না ফিরলে পরদিনের স্বাভাবিক কাজেও তার প্রভাব পড়ছে।
পড়াশোনায় ব্যাঘাত, বিপাকে শিক্ষার্থীরা
লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন শিক্ষার্থীরাও। সন্ধ্যা ও রাতে পড়াশোনার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় তাদের পড়ার ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে। পরীক্ষার্থী ও উচ্চশিক্ষার শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও প্রকট। কেউ কেউ বিকল্প আলোর ব্যবস্থা করে পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে তা সবসময় সম্ভব হচ্ছে না।
অভিভাবকদেরও এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের মতে, নিয়মিত পড়াশোনার সময় বিদ্যুৎ না থাকলে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন অবস্থায় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া অনেকের পক্ষেই কষ্টকর।
ব্যাহত ব্যবসা-বাণিজ্য ও দাপ্তরিক কাজ
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব শুধু বাসাবাড়িতে সীমাবদ্ধ নেই। নগরীর দোকানপাট, ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কার্যালয় ও বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়ছে। বিদ্যুৎনির্ভর যন্ত্রপাতি বন্ধ থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠানের কাজের গতি কমে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
স্থানীয় পর্যায়ে আদালতের বিচারিক কার্যক্রমও লোডশেডিংয়ের কারণে বিঘ্নিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। একইভাবে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও অন্যান্য যন্ত্রপাতিনির্ভর কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
সংবাদপত্র প্রকাশেও পড়েছে প্রভাব
লোডশেডিংয়ের কারণে নগরীর সংবাদকর্মীরাও সমস্যায় পড়ছেন। বিশেষ করে রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় স্থানীয় সংবাদপত্র ছাপার কাজে বিঘ্ন ঘটছে। সংবাদ প্রস্তুত থেকে শুরু করে মুদ্রণ পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে বিদ্যুতের প্রয়োজন থাকায় সরবরাহের অনিশ্চয়তা নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার ক্ষেত্রে চাপ বাড়াচ্ছে।
এতে শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মীদের কর্মঘণ্টা বাড়ছে না, সংবাদপত্র প্রস্তুত ও বিতরণের সময়সূচিও প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
চাহিদার তুলনায় অর্ধেক সরবরাহ
বরিশাল ওজোপাডিকো লিমিটেডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মঞ্জুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, নগরীতে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১০০ মেগাওয়াট। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র অর্ধেক। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় লোডশেডিংয়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে তিনি জানান।
বিদ্যুৎ বিভাগের এই তথ্য থেকেই সংকটের মাত্রা সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। প্রায় দেড় লাখ গ্রাহকের জন্য যেখানে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন, সেখানে সরবরাহ যদি প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে, তাহলে স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এর সরাসরি চাপ গিয়ে পড়ে আবাসিক গ্রাহক থেকে শুরু করে ব্যবসা ও সেবাখাতের ওপর।
দ্রুত সমাধানের দাবি
নগরবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং চলতে থাকলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, অসুস্থ ব্যক্তি, শিক্ষার্থী এবং বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের ওপর এর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে।
বাসিন্দারা বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি দ্রুত কমানো এবং লোডশেডিংয়ের সময় ও মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে আনার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং দীর্ঘ সময়ের বিদ্যুৎ বিভ্রাট থেকে নগরবাসীকে দ্রুত মুক্তি দেবে।
বরিশালের মানুষের কাছে বিদ্যুৎ এখন শুধু আরাম বা সুবিধার বিষয় নয়; শিক্ষা, ব্যবসা, দাপ্তরিক কাজ, সংবাদ প্রকাশ এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে এটি সরাসরি যুক্ত। ফলে দিনে ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার পরিস্থিতির দ্রুত অবসান চান নগরবাসী।









