নারী এশিয়া কাপ ও এশিয়ান গেমসকে সামনে রেখে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলে শেষ মুহূর্তে পরিবর্তন এসেছে। ডান ঊরুর চোটের কারণে দুই আন্তর্জাতিক আসর থেকেই ছিটকে গেছেন বাঁহাতি পেসার ফারিহা ইসলাম তৃষ্ণা। তাঁর পরিবর্তে ১৭ বছর বয়সী ডানহাতি পেসার ফারজানা ইয়াসমিনকে ১৫ সদস্যের দলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২৬ আগস্ট বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর জাতীয় দলের হয়ে বড় মঞ্চে অভিষেকের অপেক্ষায় থাকা ফারজানার সামনে খুলে গেছে গুরুত্বপূর্ণ একটি সুযোগ।
২৩ বছর বয়সী তৃষ্ণার এমআরআই পরীক্ষায় ডান ঊরুতে গ্রেড-২ টিয়ার ধরা পড়েছে। চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফিরতে তাঁর প্রায় চার থেকে ছয় সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। সেই হিসাবে ২৮ আগস্ট থেকে শুরু হতে যাওয়া নারী এশিয়া কাপ তো বটেই, সেপ্টেম্বরের এশিয়ান গেমসেও তাঁর খেলা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত দুই আসরের দল থেকেই তাঁকে সরিয়ে নিতে হয়েছে।
বাংলাদেশের পেস বোলিং আক্রমণে তৃষ্ণা বেশ কয়েক বছর ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। নতুন বলে আক্রমণ শুরু করার পাশাপাশি মাঝের ওভারেও তাঁর বোলিং দলের জন্য কার্যকর। সর্বশেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। ফলে তাঁর অনুপস্থিতিতে বোলিং পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হবে বাংলাদেশকে। নতুন বলের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার পাশাপাশি মাঝের ওভারে চাপ সামলানোর কাজটিও অন্য পেসারদের ওপর বাড়বে।
দলে থাকা মারুফা আক্তার, ফাহিমা খাতুন, সুলতানা খাতুন, রাবেয়া খান ও সানজিদা আক্তার মেঘলাদের তাই বাড়তি দায়িত্ব নিতে হতে পারে। বিশেষ করে দুই ম্যাচের মাঝের সময় কম থাকলে বোলারদের ওপর কাজের চাপ আরও বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে তরুণ ফারজানার অন্তর্ভুক্তি বাংলাদেশ দলের জন্য যেমন প্রয়োজনের সমাধান, তেমনি ভবিষ্যতের একজন পেসারকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পরিবেশে যাচাই করার সুযোগও।
ফারজানা ইয়াসমিন এখনো জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক করেননি। তবে বয়সভিত্তিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। চলতি বছরের এশিয়া কাপের আগে জাতীয় দলের সম্ভাব্য খেলোয়াড়দের তালিকাতেও তাঁর নাম ছিল। সাম্প্রতিক অনুশীলন ও প্রস্তুতি কার্যক্রমে তাঁর পারফরম্যান্স নির্বাচকদের নজর কেড়েছে।
বাংলাদেশ নারী দলের ব্যাটিং কোচ নাসিরুদ্দিন ফারুকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ফারজানার বোলিংয়ে গতির বৈচিত্র্য রয়েছে এবং তিনি স্লোয়ার বল করতে পারেন। নিচের দিকে ব্যাট হাতেও অবদান রাখার সামর্থ্য রয়েছে তাঁর। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এমন একজন খেলোয়াড় বাড়তি মূল্য দিতে পারেন, যিনি মূল দায়িত্বের পাশাপাশি ব্যাটিংয়েও কিছুটা অবদান রাখতে সক্ষম।
এশিয়া কাপে বাংলাদেশের সামনে কঠিন লড়াই
২০২৬ নারী এশিয়া কাপে বাংলাদেশ রয়েছে ‘বি’ গ্রুপে। একই গ্রুপে আছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন শ্রীলঙ্কা, স্বাগতিক সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইন্দোনেশিয়া। অন্য গ্রুপে খেলবে ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও হংকং।
দুবাইয়ে ২৮ আগস্ট থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হবে এবারের প্রতিযোগিতা। পুরো আসরই অনুষ্ঠিত হবে টি-টোয়েন্টি সংস্করণে। বাংলাদেশ ৩১ আগস্ট ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে অভিযান শুরু করবে। এরপর ৬ সেপ্টেম্বর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে খেলবে তারা। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ৮ সেপ্টেম্বর স্বাগতিক সংযুক্ত আরব আমিরাতের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ।
প্রতিটি ম্যাচই বাংলাদেশের জন্য আলাদা চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসবে। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচটি গ্রুপের শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। গ্রুপের শীর্ষ দুই দল সেমিফাইনালের টিকিট পাবে। ১০ ও ১১ সেপ্টেম্বর দুটি সেমিফাইনাল এবং ১৩ সেপ্টেম্বর ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে।
বাংলাদেশ অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি আগেই জানিয়েছেন, এবার দলের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য সেমিফাইনালের বাধা পেরিয়ে ফাইনালে ওঠা। অতীতে একাধিকবার শেষ চারে গিয়ে থেমে যাওয়ার অভিজ্ঞতা থাকলেও এবার সেই অবস্থার পরিবর্তন করতে চায় বাংলাদেশ। সে লক্ষ্য পূরণে দলকে ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং—তিন বিভাগেই ধারাবাহিক থাকতে হবে।
এশিয়ান গেমসেও অপেক্ষা করছে বড় পরীক্ষা
এশিয়া কাপ শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ নারী দলের সামনে থাকবে আরেকটি বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা। ২০তম এশিয়ান গেমস ১৭ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর জাপানের আইচি-নাগোয়ায় অনুষ্ঠিত হবে। নারী ক্রিকেটে বাংলাদেশ সরাসরি কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে প্রতিযোগিতা শুরু করবে।
সূচি অনুযায়ী, ১৭ সেপ্টেম্বর কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ চীন। ওই ম্যাচে জয় পেলে সেমিফাইনালে ভারত অথবা জাপানের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে এশিয়া কাপের পরপরই বাংলাদেশকে ভিন্ন পরিবেশে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় নামতে হবে।
দুবাইয়ের কন্ডিশন থেকে জাপানের পরিবেশে দ্রুত মানিয়ে নেওয়াও দলের জন্য বড় বিষয় হতে পারে। ভ্রমণ, পুনরুদ্ধার ও প্রস্তুতির সময় সীমিত থাকায় খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতা এবং বোলিং বিভাগের গভীরতা বিশেষ গুরুত্ব পাবে। এই জায়গাতেই তৃষ্ণার অনুপস্থিতি বাংলাদেশকে কিছুটা সমস্যায় ফেলতে পারে।
তবে ফারজানার জন্য পরিস্থিতিটি ভিন্ন অর্থ বহন করছে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এত বড় প্রতিযোগিতায় দলের সঙ্গে থাকার সুযোগ তাঁর ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হয়ে উঠতে পারে। সরাসরি একাদশে জায়গা পাওয়া নিশ্চিত না হলেও দলের সঙ্গে থাকা, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপ ও প্রস্তুতির ধরন কাছ থেকে দেখা এবং সুযোগ এলে নিজেকে প্রমাণ করা—সবই তাঁর ভবিষ্যৎ পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হবে।
তৃষ্ণার বদলে ফারজানাসহ বাংলাদেশের ১৫ সদস্যের দল
নিগার সুলতানা জ্যোতির নেতৃত্বে এবং নাহিদা আক্তারের সহ-অধিনায়কত্বে বাংলাদেশ দলে অভিজ্ঞতার সঙ্গে তারুণ্যের সমন্বয় রাখা হয়েছে। তৃষ্ণার পরিবর্তনটি কার্যকর হওয়ার পর এশিয়া কাপ ও এশিয়ান গেমসের জন্য বাংলাদেশের হালনাগাদ দল হলো—
নিগার সুলতানা জ্যোতি (অধিনায়ক), নাহিদা আক্তার (সহ-অধিনায়ক), দিলারা আক্তার, জুয়াইরিয়া ফেরদৌস, শারমিন আক্তার সুপ্তা, সারমিন সুলতানা, সোবহানা মোস্তারি, স্বর্ণা আক্তার, ঋতু মনি, ফাহিমা খাতুন, রাবেয়া খান, মারুফা আক্তার, সুলতানা খাতুন, সানজিদা আক্তার মেঘলা ও ফারজানা ইয়াসমিন।
তৃষ্ণার চোট নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের পরিকল্পনায় ধাক্কা দিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নতুন মুখ তুলে আনার সুযোগও তৈরি হয়েছে এর মধ্য দিয়ে। এখন ফারজানার সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হলো সুযোগের অপেক্ষায় প্রস্তুত থাকা এবং সুযোগ এলে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেওয়া। বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তরুণ এই পেসার কত দ্রুত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের গতি ও চাপের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন।









