জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

১৯৯৬-২০০১: জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাতের স্বর্ণযুগের সূচনা

বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ইতিহাসে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালকে শুধু একটি সরকারের মেয়াদ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। বরং এই পাঁচ বছর ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি-বিদ্যুৎ অবকাঠামো গড়ে তোলার সূচনাকাল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যে পরিকল্পনা, উদ্যোগ ও বিনিয়োগের পথে হাঁটতে শুরু করেছিল, পরবর্তী সময়ে তারই ওপর দাঁড়িয়ে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বড় ধরনের সম্প্রসারণ সম্ভব হয়েছিল।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অবস্থা ছিল বেশ নাজুক। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালের সময়ে গ্যাস উত্তোলন, সঞ্চালন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছিল। বাখরাবাদ ও ফেনী গ্যাসক্ষেত্র থেকে অতিরিক্ত গ্যাস উত্তোলনের ফলে উৎপাদন সক্ষমতা কমে আসার পাশাপাশি দেশের এক অঞ্চলের গ্যাস অন্য অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় সঞ্চালন অবকাঠামোরও ঘাটতি ছিল।

এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিল আশুগঞ্জ-বাখরাবাদ গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে গ্যাসের মজুত থাকলেও প্রয়োজনীয় সঞ্চালন ব্যবস্থা না থাকায় সেই গ্যাস চট্টগ্রাম অঞ্চলে যথাযথভাবে পৌঁছানো যাচ্ছিল না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানায়। শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়, বিদ্যুৎ সংকট বাড়ে এবং দেশজুড়ে কয়েক ঘণ্টার লোডশেডিং তখন প্রায় নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়। এখানেই ১৯৯৬-২০০১ সময়কালটির গুরুত্ব।

শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় এসে সমস্যাটিকে কেবল বিদ্যুৎকেন্দ্র বাড়ানোর সমস্যা হিসেবে দেখেনি; বরং বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ, গ্যাস সঞ্চালন এবং জাতীয় গ্রিড সম্প্রসারণকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। এই দৃষ্টিভঙ্গিই সম্ভবত ওই সময়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও নীতিগত পরিবর্তন।

মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ আশুগঞ্জ-বাখরাবাদ ক্রস-কান্ট্রি গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়। এর ফলে দেশের পূর্বাঞ্চলে গ্যাস সঞ্চালন নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হয় এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সার কারখানাগুলোর উৎপাদনও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করে।

শুধু পূর্বাঞ্চল নয়, দেশের পশ্চিমাঞ্চলকেও গ্যাসের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু যমুনা বহুমুখী সেতু বরাবর পাইপলাইন নির্মাণের পাশাপাশি এলেঙ্গা থেকে হাটিকুমরুল ও বাঘাবাড়ী পর্যন্ত গ্যাস সঞ্চালন অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়। ফলে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের একটি নতুন দ্বার খুলে যায়।

একই সময়ে সালদা, মেঘনা ও বিয়ানীবাজার গ্যাসক্ষেত্র জাতীয় গ্যাস গ্রিডে যুক্ত হয়। সাঙ্গু অফশোর গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন করে জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করা হয়। জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্রও উন্নয়ন করা হয়। পাশাপাশি মৌলভীবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি সম্ভাবনার ভিত্তিও শক্তিশালী হয়।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু কত গ্যাস মাটির নিচে আছে, তার ওপর নির্ভর করে না। সেই গ্যাস কোথায় উৎপাদন হচ্ছে, কোথায় প্রয়োজন, কীভাবে সেখানে পৌঁছানো হবে এবং সেই গ্যাস দিয়ে কতটা বিদ্যুৎ বা শিল্প উৎপাদন করা যাবে—সবকিছুই সমান গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৬-২০০১ সময়ে এই পুরো চেইনটিকে একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়ার উদ্যোগ দেখা যায়।

বিদ্যুৎ খাতেও একই ধরনের পরিবর্তনের সূচনা হয়।

Private Sector Power Generation Policy-এর আওতায় মেঘনাঘাটে ৪২০ মেগাওয়াট এবং হরিপুরে ৩৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখনকার বাস্তবতায় বেসরকারি খাতকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যুক্ত করার এই সিদ্ধান্ত ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদনে রাষ্ট্রের একক নির্ভরতা কমিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা হয়।

বার্জ-মাউন্টেড পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন এবং গ্যাস গ্রিডের কাছাকাছি এলাকায় ছোট ক্ষমতার আইপিপি স্থাপনের মতো উদ্যোগও নেওয়া হয়। অর্থাৎ বড় প্রকল্পের পাশাপাশি দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে ছোট ও বিকল্প মডেলও বিবেচনায় রাখা হয়েছিল।

এর ফল কী হয়েছিল?

২০০১ সালের দিকে এসে বিদ্যুৎ খাতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৫২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল—দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে একটি দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রসারণের পথে নেওয়ার ভিত্তি তখন তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

আমার কাছে ১৯৯৬-২০০১ সময়কালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানেই। উন্নয়ন মানে শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নয়। একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে তার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস না থাকলে সেটি অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। আবার গ্যাস থাকলেও সঞ্চালন ব্যবস্থা না থাকলে সেই গ্যাস বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছাবে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও জাতীয় গ্রিড দুর্বল থাকলে সেই বিদ্যুৎ মানুষের ঘরে পৌঁছানো কঠিন। ফলে জ্বালানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ—সবগুলোকে একই সূত্রে গাঁথতে হয়।

১৯৯৬-২০০১ সময়ে সেই সমন্বিত চিন্তারই একটি প্রাথমিক রূপ দেখা গিয়েছিল।

তবে রাজনৈতিক সরকারের সাফল্য মূল্যায়নে একটি বিষয়ও মনে রাখা দরকার—কোনো সরকারের নেওয়া প্রতিটি প্রকল্পের সুফল তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায় না। কিছু প্রকল্পের পরিকল্পনা এক সরকারের সময়ে হয়, বাস্তবায়ন হয় পরবর্তী সময়ে। আবার কোনো কোনো প্রকল্পের সুফল পাওয়া যায় আরও বহু বছর পরে। তাই ১৯৯৬-২০০১ সালের অর্জন মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রকল্পের পরিকল্পনা, অর্থায়ন, নির্মাণ, উৎপাদন শুরু এবং দীর্ঘমেয়াদি সুফল—এই পুরো সময়রেখাটিই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

তারপরও ইতিহাসের একটি কঠিন সত্য হলো, ১৯৯৬ সালে যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে ভুগছিল, ২০০১ সালে সেই বাংলাদেশ একটি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী জ্বালানি অবকাঠামোর ভিত্তি নিয়ে পরবর্তী দশকের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অবস্থানে ছিল।

এই ধারাবাহিকতা পরবর্তী সময়ে কতটা ধরে রাখা হয়েছিল, সেটিই অবশ্য আলাদা প্রশ্ন। ২০০১ সালের পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, নতুন উৎপাদন সক্ষমতা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তার ফল কয়েক বছরের মধ্যেই দৃশ্যমান হয়। আবারও বাড়তে থাকে বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিং।

সুতরাং ১৯৯৬-২০০১ সময়কালকে শুধু আওয়ামী লীগ সরকারের পাঁচ বছর হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটিকে দেখতে হবে বাংলাদেশের জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনাকাল হিসেবে। এই সময়ে নেওয়া গ্যাস অনুসন্ধান, গ্যাস সঞ্চালন, জাতীয় গ্রিড সম্প্রসারণ, বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগগুলো পরবর্তী বাংলাদেশের জ্বালানি অবকাঠামোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছিল।

একটি দেশের উন্নয়ন অনেকটা নদীর মতো। আজ যে স্রোত দেখা যায়, তার উৎস হয়তো বহু বছর আগে তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ক্ষেত্রেও ১৯৯৬-২০০১ সালের সময়কালকে সেই উৎসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর