জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

বিশ্ববাজারে কমল স্বর্ণের দাম, নজর মূল্যস্ফীতির তথ্যে

তিন মাসের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠার একদিন পর আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম কিছুটা কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের আগে বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ আগামী মাসগুলোতে সুদের হার নিয়ে কী ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তা বোঝার চেষ্টা করছেন তারা।

বুধবার ২৬ আগস্ট বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টা ১০ মিনিটে আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিক লেনদেনে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৬৪২ দশমিক ৭৪ ডলারে নেমে আসে। এর আগের দিন মঙ্গলবার স্বর্ণের দাম মে মাসের মাঝামাঝির পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল। ফলে সাম্প্রতিক উত্থানের পর বাজারে কিছুটা মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সরবরাহভিত্তিক স্বর্ণ লেনদেনে দাম শূন্য দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৭০০ দশমিক ৭০ ডলারে পৌঁছেছে। তাৎক্ষণিক লেনদেন ও ভবিষ্যৎ সরবরাহভিত্তিক লেনদেনের দামের এই পার্থক্য বাজারে বিনিয়োগকারীদের ভিন্ন ভিন্ন প্রত্যাশার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মূল্যস্ফীতির তথ্যে বাজারের নজর

বিনিয়োগকারীদের প্রধান নজর এখন যুক্তরাষ্ট্রের জুলাই মাসের ব্যক্তিগত ভোগ ব্যয় মূল্যসূচকের দিকে। ফেডারেল রিজার্ভ মূল্যস্ফীতির প্রবণতা পরিমাপের ক্ষেত্রে এই সূচককে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। বুধবার গ্রিনিচ মান সময় দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে তথ্যটি প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে।

মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রত্যাশার চেয়ে দুর্বল হলে ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে স্বর্ণের বাজারেও। কারণ স্বর্ণ কোনো সুদ প্রদান করে না। ফলে সুদের হার কমলে বা ভবিষ্যতে সুদ কমার প্রত্যাশা বাড়লে স্বর্ণ ধরে রাখার সুযোগ-ব্যয় কমে যায়।

এ ছাড়া শুক্রবার জ্যাকসন হোল সম্মেলনে ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শের বক্তব্যের দিকেও বাজারের নজর থাকবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ সুদের হার সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

এক্সনেসের আর্থিক বাজার কৌশলবিদ ওয়ায়েল মাকারেমের মতে, মূল্যস্ফীতি কমে আসার পাশাপাশি ফেডারেল রিজার্ভের পক্ষ থেকে তুলনামূলক নমনীয় বার্তা এলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত সুদের হার কমার প্রত্যাশা জোরদার হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সুদ না দেওয়া সম্পদ হিসেবে স্বর্ণে বিনিয়োগের সুযোগ-ব্যয় কমবে এবং দাম বাড়ার পক্ষে নতুন সমর্থন তৈরি হতে পারে।

মার্কিন অর্থনীতি ও সুদের হার

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি নিয়ে প্রকাশিত কিছু তথ্যও বাজারের প্রত্যাশায় পরিবর্তন এনেছে। চলতি মাসে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কৃষি খাতের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান অপ্রত্যাশিতভাবে কমেছে। একই সময়ে ভোক্তা মূল্যস্ফীতির তথ্যও বাজারের প্রত্যাশার সঙ্গে মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।

এ ধরনের তথ্যের পর সেপ্টেম্বরে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমাতে পারে—এমন প্রত্যাশা কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। ফেডারেল তহবিলের সুদের হার নিয়ে বাজারের সম্ভাবনা পরিমাপকারী সিএমই ফেডওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, আগামী মাসে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সম্ভাবনা বর্তমানে ৬১ দশমিক ৬ শতাংশ।

তবে সুদের হার নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আরও তথ্য বিবেচনা করবে ফেডারেল রিজার্ভ। তাই বিনিয়োগকারীরা এখন একের পর এক অর্থনৈতিক সূচকের দিকে নজর রাখছেন।

আর্থিক ঝুঁকি ও ভূরাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ

স্বর্ণের বাজারে শুধু সুদের হার নয়, বৈশ্বিক আর্থিক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও বড় ভূমিকা রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বাড়তে পারে।

সম্প্রতি মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের বন্ড পুনঃক্রয় পরিকল্পনার ঘোষণার পরও স্বর্ণের বাজারে উল্লেখযোগ্য উত্থান দেখা গিয়েছিল। এর আগে মঙ্গলবার স্বর্ণ তিন মাসের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। বাজারে নিরাপদ সম্পদের চাহিদা এবং সুদের হার কমার সম্ভাবনা—দুই বিষয়ই সেই উত্থানে ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও নতুন কিছু পরিবর্তন এসেছে। হরমুজ প্রণালির পরিচালনা নিয়ে প্রতিবেশী ওমানের সঙ্গে ইরান নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে বলে জানা গেছে। এর পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে কিছুটা পতন দেখা যায়।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের ধাক্কা বৈশ্বিক অর্থনীতি আশঙ্কার তুলনায় ভালোভাবে সামাল দিয়েছে। তবে কয়েকটি দেশের অবনতিশীল আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

স্বর্ণের পরবর্তী দামের সম্ভাব্য মাত্রা

বাজারের কারিগরি বিশ্লেষণেও স্বর্ণের সামনে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মাত্রার কথা উঠে এসেছে। রয়টার্সের কারিগরি বিশ্লেষক ওয়াং তাওয়ের মতে, তাৎক্ষণিক লেনদেনে স্বর্ণের দাম আবার ৪ হাজার ৬৮১ ডলারের প্রতিরোধমাত্রা পরীক্ষা করতে পারে।

এই মাত্রা অতিক্রম করতে পারলে দাম ৪ হাজার ৭০৭ থেকে ৪ হাজার ৭৪৩ ডলারের মধ্যে উঠতে পারে বলে তাঁর বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাজারের গতিপথ নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতির তথ্য, ফেডারেল রিজার্ভের নীতিগত সংকেত, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিবেশের ওপর।

এদিকে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। বুধবার রুপার দাম শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৬৯ দশমিক ২৬ ডলারে উঠেছে। প্লাটিনামের দাম শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৮৬৫ দশমিক ৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে। আর প্যালাডিয়ামের দাম ১ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৩৪৩ দশমিক ৭৫ ডলারে পৌঁছেছে।

সব মিলিয়ে, স্বর্ণের সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বগতির পর বুধবারের পতনকে বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্য এবং ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী নীতিগত বার্তা প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর