জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

হরমুজ প্রণালিতে ৪৫টি বিদেশি তেল-গ্যাস ট্যাংকার কালো তালিকাভুক্ত করল ইরান

কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক জলপথ হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। নেভিগেশন ও চলাচলের বিধিমালা লঙ্ঘনের দায়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের অন্তত ৪৫টি জ্বালানিবাহী ট্যাংকারকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে ইরানের নবগঠিত সংস্থা ‘পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ’। গত রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সামুদ্রিক নজরদারির দায়িত্বে আসা সংস্থাটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়।

কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নৌযানগুলোর মধ্যে অতি বৃহৎ অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ (ভিএলসিসি), তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এবং প্রক্রিয়াজাত জ্বালানি পরিবহনকারী নানা ধরনের ট্যাংকার রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দুই শীর্ষ রফতানিকারক দেশ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মালিকানাধীন বেশ কয়েকটি বিশ্বখ্যাত কোম্পানির নৌযান রয়েছে এই তালিকায়। বিশেষ করে আমিরাতের ‘এডিএনওসি লজিস্টিকস অ্যান্ড শিপিং’, তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘নেভিগ৮ ট্যাংকারস’ এবং সৌদি আরবের জাতীয় শিপিং সংস্থা ‘বাহরি’-র একাধিক জাহাজ এর অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া ইউরোপ ও এশিয়ার শীর্ষ সারির কোম্পানি—যেমন নরওয়ের ‘ক্লাভেনেস শিপ ম্যানেজমেন্ট’ ও ‘স্টল্ট ট্যাংকারস’ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সামুদ্রিক পরিবহন সংস্থা ‘সিনোকর’-এর মালিকানাধীন একাধিক জাহাজকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

ইরানি কর্তৃপক্ষের বার্তায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত নৌযানগুলোকে কেবল চিহ্নিত করেই ছেড়ে দেওয়া হবে না; নিয়মভঙ্গের দায়ে তাদের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের জরিমানা আদায় করা হতে পারে। এমনকি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে চলাচলের সময় এসব জাহাজ আটক বা সেগুলোতে থাকা সব মালামাল ও কার্গো বাজেয়াপ্ত করারও কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক সমুদ্রে এই কালো তালিকাভুক্ত ট্যাংকারগুলোর কাছ থেকে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে পণ্য স্থানান্তরের (শিপ-টু-শিপ ট্রান্সফার) কাজে অংশ নেওয়া অন্য যেকোনো ছোট-বড় সহায়ক নৌযানের বিরুদ্ধেও সমমানের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঠিক কী ধরনের সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক নিয়ম ভঙ্গের দায়ে এসব জাহাজকে ‘নন-কমপ্লায়েন্ট’ বা নিয়ম লঙ্ঘনকারী চিহ্নিত করা হলো, তা তেহরান বিশদভাবে খুলে বলেনি। তবে এর আগে ইরানি কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছিল, কৌশলগত হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে যাতায়াত করতে হলে প্রতিটি শিপিং সংস্থাকে ইরানের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট আগাম অনুমোদন নিতে হবে এবং তাদের নিরাপত্তা সেবার জন্য নির্ধারিত ফি দিতে হবে।

যেসব আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থা বা জাহাজের মালিক নিজেদের নাম এই কালো তালিকা থেকে মুক্ত করতে চান, তাদের প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও ব্যাখ্যাসহ ইরানের সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন দাখিল করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস আমদানিকারকদের হরমুজ প্রণালি কেন্দ্রিক নতুন কোনো চুক্তি করার আগে এই তালিকাটি ভালোভাবে যাচাই করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্প্রতি তেহরানের ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোরতম অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকির পরপরই ইরানের পক্ষ থেকে এই তীব্র প্রতিক্রিয়া ও পাল্টা পদক্ষেপ এলো। যেকোনো নতুন আন্তর্জাতিক হুমকি বা সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ইরান ধ্বংসাত্মক জবাব দেবে বলে আগেই সতর্ক করেছিল। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি তেল ও নৌপরিবহনের বিরুদ্ধে নিজস্ব কৌশলে নৌ অবরোধ আরোপের নানা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্বের সার্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য হরমুজ প্রণালির ভূমিকা অপরিসীম। চলমান সংকট শুরুর আগে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেল ও এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশই স্থানান্তরিত হতো মাত্র ২১ মাইল প্রশস্ত এই সংকীর্ণ প্রণালি দিয়ে। সাম্প্রতিক উত্তেজনায় স্বাভাবিক বাণিজ্যিক ট্যাংকার চলাচল স্থবির হয়ে পড়ায় যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনীর বিশেষ তত্ত্বাবধানে বিকল্প উপায়ে মার্কিন পাহারায় কিছু ট্যাংকার পার করানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, তাঁদের নৌবাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তার কারণেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে দিনে গড়ে ৮০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল বাইরে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। পারস্য উপসাগরে শক্তিশালী দেশগুলোর এমন পাল্টাপাল্টি সামরিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে আবারও বড় ধরনের অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর