অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দুই টেস্টের লাল বলের লড়াই শেষ হলো ১-১ সমতায়। তবে সিরিজের ফল কিংবা স্বাগতিকদের জয় ছাপিয়ে এখন ক্রিকেটবিশ্বে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে মেকাই টেস্টের উইকেট নিয়ে। দুই দিনও টিকতে না পারা সেই টেস্টে বাংলাদেশকে এক ইনিংস ও ৫১ রানের ব্যবধানে হারায় অস্ট্রেলিয়া। এর আগে সিরিজের প্রথম টেস্টে ডারউইনে স্বাগতিকদের হারিয়ে ঐতিহাসিক এক জয় তুলে নিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু মেকাইয়ের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনার চরম বোলারবান্ধব উইকেট দেখে ক্ষোভ চেপে রাখতে পারেননি ইংল্যান্ডের সাবেক গতি তারকা স্টুয়ার্ট ব্রড। তাঁর মতে, এই পিচ এতটাই অস্বাভাবিক আচরণ করছিল যে বাংলাদেশ যদি টসে জিতে আগে বোলিংয়ের সুযোগ পেত, তবে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকেই হয়তো তারা ৬০ রানে গুটিয়ে দিতে পারত।
সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে টসে জিতে বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতে মোটেও ভুল করেননি অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। মেকাইয়ের উইকেটে প্রথম ওভার থেকেই শুরু হয় বলের মারাত্মক সুইং এবং অসমান বাউন্স। পেসার মিচেল স্টার্কের বিষাক্ত আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে কোনো প্রতিহত গড়ে তুলতে পারেননি বাংলাদেশের ব্যাটাররা। প্রথম ইনিংসে সফরকারীরা অলআউট হয়ে যায় মাত্র ৬৪ রানে। জবাবে ক্যামেরন গ্রিনের বুকচিতিয়ে করা ৬৭ রানের ওপর ভর করে নিজেদের প্রথম ইনিংসে ২১০ রান তোলে অস্ট্রেলিয়া। ১৪৬ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমেও চিত্র বদলায়নি। বাংলাদেশি ব্যাটারদের ব্যর্থতায় দ্বিতীয় ইনিংস গুটিয়ে যায় মাত্র ৯৫ রানে। ফলে আড়াই দিনেরও বেশি সময় বাকি থাকতেই দুই দিনে শেষ হয়ে যায় পুরো ম্যাচ।
জনপ্রিয় ক্রিকেটভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল ‘ফর দ্য লাভ অব ক্রিকেট’-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেকাইয়ের এই উইকেট বানানোর কৌশল নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন ব্রড। তিনি বলেন, “ম্যাচ জিতে অস্ট্রেলিয়া সিরিজে সমতা ফিরিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ঘরের মাঠে তাদের উইকেট তৈরির নীতি নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যায়। মিচেল স্টার্ক নিশ্চিতভাবেই তার সেরাটা উজাড় করে দিয়েছে, বল দুর্দান্ত সুইং করিয়েছে। কিন্তু পিচের সব জায়গায় অতিরিক্ত বাউন্স ও অনিয়মিত সুইং যেকোনো দলের ব্যাটারদের জন্যই মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।”
সাবেক এই ইংলিশ পেসারের যুক্তি, শক্তিমত্তার বিচারে যেসব দল এগিয়ে থাকে, তাদের উচিত সমতল বা স্বাভাবিক স্পোর্টিং উইকেটে খেলা। কারণ অতিরিক্ত পেসবান্ধব পিচ তৈরি করলে ম্যাচের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নির্ভর করে ফেলে লটারির মতো ‘টস’-এর ওপর। ব্রড আরও যোগ করেন, “দল হিসেবে আপনি যদি নিজেদের প্রতিপক্ষের চেয়ে ঢের বেশি শক্তিশালী মনে করেন, তবে ফ্ল্যাট উইকেটে খেলুন। কারণ এই উইকেটে বাংলাদেশ যদি টসে জিতে আগে বোলিংয়ের সুযোগ পেত, তারা অস্ট্রেলিয়াকে অনায়াসে ৬০ রানে গুটিয়ে দিয়ে স্বাগতিকদের চরম বিপদে ফেলে দিত।”
পরিসংখ্যানও ব্রডের এই বক্তব্যের পেছনের যৌক্তিকতাকে জোরালোভাবে সমর্থন করছে। পুরো মেকাই টেস্টে দুই দল মিলিয়ে মোট খেলা গড়িয়েছে মাত্র ৭৫০ বল। ১৯৩২ সালের পর থেকে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ক্রিকেট ইতিহাসে এটিই চতুর্থ সর্বনিম্নে শেষ হওয়া টেস্ট। শুধু তা-ই নয়, ঘরের মাঠে খেলা সর্বশেষ সাতটি টেস্টের মধ্যে তিনটিতেই দুই দিনের মধ্যে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হতে দেখেছে অজিরা। এর আগে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ঘরের মাঠের অ্যাশেস সিরিজে পার্থ ও মেলবোর্ন টেস্টের আয়ুও দুই দিনের বেশি গড়াতে পারেনি। চার ও পাঁচ দিনের টেস্ট ম্যাচ এভাবে দুই দিনে ধসে পড়ায় টেস্ট ক্রিকেটের নন্দনতত্ত্ব এবং স্পোর্টিং উইকেটের সংজ্ঞা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।









