বিশ্ববাজারে টানা দুই সপ্তাহ অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার পর সোমবার কিছুটা কমেছে। সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির পর বিনিয়োগকারীদের একাংশ মুনাফা তুলে নেওয়ায় বাজারে বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় এই দরপতনকে স্থায়ী স্বস্তির সংকেত হিসেবে দেখার সুযোগ কম।
সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ২৩ ডলার বা ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৩ দশমিক ১৬ ডলারে নেমে আসে। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম কমেছে ১ দশমিক ৩৬ ডলার বা ১ দশমিক ৬ শতাংশ। এতে ডব্লিউটিআইয়ের প্রতি ব্যারেলের দাম দাঁড়ায় ৮৫ দশমিক ৭০ ডলার।
সাম্প্রতিক দরবৃদ্ধির পর বিনিয়োগকারীদের মুনাফা তুলে নেওয়াই সোমবারের দরপতনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গত সপ্তাহে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই—দুই ধরনের তেলের দামই টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো বেড়েছিল। ওই সময়ে উভয় বাজারেই দাম ৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়। ফলে আগে কম দামে কেনা তেল বিক্রি করে লাভ নিশ্চিত করার প্রবণতা তৈরি হয়। বাজারে এই বিক্রির চাপই সোমবারের মূল্যহ্রাসে ভূমিকা রাখে।
তবে তেলের বাজারের মূল উদ্বেগ এখনো ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা অচলাবস্থায় পড়ার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন কমে যাওয়ার খবরে গত সপ্তাহ থেকেই সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল। বিশ্বের তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়ে থাকে। ফলে সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু ইরানের রপ্তানি নয়, উপসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সোমবার ইরানকে লক্ষ্য করে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিতে পারেন—এমন আলোচনা রয়েছে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। ইরানের তেল সরবরাহ আন্তর্জাতিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় রপ্তানি কমে গেলে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্যে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে বিকল্প উৎস থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ দ্রুত নিশ্চিত করা না গেলে বাজারে ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
এখানেই তেলের বাজারে দুটি বিপরীত প্রবণতা একসঙ্গে কাজ করছে। একদিকে নিষেধাজ্ঞা, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ঝুঁকি দাম বাড়ানোর পক্ষে কাজ করছে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির পর বিনিয়োগকারীদের মুনাফা তুলে নেওয়া দাম কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে প্রতিদিনের লেনদেনে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এবং বিনিয়োগকারীদের আর্থিক সিদ্ধান্ত—দুই ধরনের শক্তির প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ইরান নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনার নিন্দা করেছে। একই সময়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। ফলে তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপও তেলের বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো সম্ভব হলে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত হতে পারে। বিপরীতে উত্তেজনা বাড়লে বাজারে ঝুঁকি প্রিমিয়াম আরও বাড়তে পারে।
ইতোমধ্যে মার্কিন অবরোধের প্রভাব ইরানি তেলের বাণিজ্যেও দেখা যাচ্ছে। চীনা ক্রেতাদের কাছে ইরানি অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমেছে এবং একই সঙ্গে সেই তেলের দাম বেড়েছে। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কেবল রাজনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; সরাসরি বাণিজ্যিক লেনদেনেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে বাগদাদের অনুরোধের পর ইরান ইরাকের কয়েকটি তেলবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। এতে সীমিত পরিসরে হলেও তেল পরিবহন ব্যবস্থায় কিছুটা স্বস্তি তৈরি হয়েছে। তবে এই পদক্ষেপ বৃহত্তর সরবরাহ ঝুঁকি কতটা কমাতে পারবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তেলের দাম কমে বা বাড়ার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্য দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার পরিচালন ব্যয় এবং পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়তে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের মূল্যস্ফীতি ও ভোক্তা পর্যায়ের ব্যয়ের ওপরও পড়তে পারে। আবার তেলের দাম দ্রুত কমে গেলে আমদানিনির্ভর দেশগুলো কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে।
বর্তমানে বাজারের সামনে কয়েকটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—যুক্তরাষ্ট্র নতুন নিষেধাজ্ঞা কতটা কঠোর করে, ইরান তার কী প্রতিক্রিয়া জানায়, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকে কি না এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহের পরিমাণ কতটা বজায় থাকে।
তাই সোমবারের দরপতনকে তেলের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি নিম্নমুখী প্রবণতার শুরু হিসেবে দেখছেন না বাজার পর্যবেক্ষকেরা। বরং সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বগতির পর এটি মুনাফা তুলে নেওয়ার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা যদি আরও বাড়ে, তাহলে সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হaয়ে তেলের দাম আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। আর কূটনৈতিক অগ্রগতি ও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলে বাজারে দামের চাপ কিছুটা কমার সুযোগ তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে, তেলের বাজার এখনো অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে। এক দিনের দরপতন বাজারের সামগ্রিক ঝুঁকি দূর করেনি। বরং আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহের গতিপথই নির্ধারণ করবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের পরবর্তী বড় মূল্যচিত্র।









