কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় পোষা বিড়ালের আঁচড়ের পর পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুর অস্বাভাবিক আচরণের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নানা ধরনের আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভিডিওটিতে শিশুটিকে বিড়ালের মতো ‘মিউ মিউ’ শব্দ করতে দেখা যায়। বিষয়টি দেখে অনেকে আশঙ্কা করেন, বিড়ালের আঁচড় থেকে শিশুটি জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়েছে।
তবে শিশুটির পরিবার এবং চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্য বলছে, এমন আশঙ্কার সঙ্গে চিকিৎসা-সংক্রান্ত মূল্যায়নের মিল নেই। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটির মধ্যে জলাতঙ্কের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। চিকিৎসকেরা বরং তার অস্বাভাবিক আচরণকে ভয়, আতঙ্ক ও মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত প্যানিক অ্যাটাক হিসেবে বিবেচনা করছেন।
শিশুটির মা জানিয়েছেন, তার মেয়ে প্রায় দুই বছর ধরে ঠান্ডা ও হাঁপানিজনিত সমস্যায় ভুগছে। এ কারণে কুষ্টিয়ায় চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত চিকিৎসা চলছে। শারীরিক সমস্যা বেড়ে গেলে এর আগেও তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। সম্প্রতি তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল থেকে তাকে ঢাকার মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঠানো হয়।
সেখানে চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরীক্ষার ফলাফল ও শিশুটির উপসর্গ পর্যালোচনা করে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তার বর্তমান সমস্যাকে জলাতঙ্কের কারণে হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। ভয় ও আতঙ্কের প্রভাবে প্যানিক অ্যাটাকের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়ে অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দিতে পারে বলে চিকিৎসকেরা ধারণা করছেন। সে অনুযায়ী বর্তমানে তার চিকিৎসা চলছে। তবে শিশুটির কাশি এখনো কিছুটা বেশি রয়েছে বলে জানিয়েছেন তার মা।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের বাসায় আগে দুটি পোষা বিড়াল ছিল। পরে বিড়াল দুটি বাসা থেকে চলে গেলে শিশুটির মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি হয়। পরিবারের সদস্যদের ধারণা, ওই ঘটনার পর মানসিক চাপ বাড়তে পারে এবং এর প্রভাবেই পরবর্তী সময়ে তার আচরণে পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। যদিও কোনো মানসিক উপসর্গের নির্দিষ্ট কারণ চূড়ান্তভাবে নির্ধারণের দায়িত্ব চিকিৎসকদেরই।
বিড়ালের আঁচড়ের ঘটনাটিও বেশ আগের বলে জানিয়েছেন শিশুটির মা। আঁচড় লাগার পর শিশুটিকে টিকা দেওয়া হয়েছিল। পরিবারের পোষা বিড়ালগুলোকেও টিকা দেওয়া ছিল বলে তিনি দাবি করেছেন। ফলে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দেখে জলাতঙ্কের মতো গুরুতর রোগের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
গত ২২ আগস্ট কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. ইকবাল হোসেনও জানিয়েছিলেন, শিশুটির মধ্যে জলাতঙ্কের কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি। তার ‘মিউ মিউ’ করা কিংবা অস্বাভাবিক আচরণের পেছনে ভয়, আতঙ্ক অথবা অতিরিক্ত মানসিক চাপ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জলাতঙ্ক অবশ্যই অত্যন্ত গুরুতর ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত প্রাণীর লালা কামড়, আঁচড় কিংবা ক্ষতস্থানে লাগার মাধ্যমে ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তাই কুকুর, বিড়াল বা অন্য কোনো প্রাণীর কামড় কিংবা আঁচড়ের ঘটনা ঘটলে বিষয়টি অবহেলা না করে দ্রুত ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিষেধক টিকা গ্রহণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে জলাতঙ্কের ঝুঁকি এবং শিশুটির বর্তমান অবস্থাকে এক করে দেখা উচিত নয়। কোনো শিশুর আচরণ হঠাৎ বদলে গেলে বা অস্বাভাবিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে এর পেছনে শারীরিক অসুস্থতা, ভয়, আতঙ্ক কিংবা অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও দেখে রোগ নির্ণয় না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ পথ।
বর্তমানে শিশুটির বুকের এক্স-রে করা হয়েছে। চিকিৎসকেরা এর প্রতিবেদন পর্যালোচনা করবেন। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে আগামী এক থেকে দুই দিনের মধ্যে তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন তার মা।
ঘটনাটি নিয়ে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওকে কেন্দ্র করে আতঙ্কের বদলে তাই চিকিৎসকদের মূল্যায়নকেই গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। শিশুটির ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত জলাতঙ্ক শনাক্ত হয়নি; বরং ভয় ও মানসিক চাপজনিত প্যানিক অ্যাটাককে তার অস্বাভাবিক আচরণের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের ঘটনা ঘটলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া এবং প্রতিষেধক ব্যবস্থার বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।









