ব্যাংকিং খাতে দিন দিন জমতে থাকা বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ উদ্ধার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে মামলানির্ভর ব্যবস্থার বাইরে আসার কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিবাদ নিষ্পত্তিতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর (Alternative Dispute Resolution) পদ্ধতির ব্যবহার বাড়াতে নীতিমালা জারি করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও পেশাগত সক্ষমতার ভিত্তিতে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর ফলে আদালতে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা হাজার হাজার খেলাপি ঋণসংক্রান্ত মামলার চাপ কমানোর পাশাপাশি অর্থ আদায়ের গতি অনেকাংশে বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-২ থেকে গত বৃহস্পতিবার এই সংক্রান্ত বিস্তারিত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এই নির্দেশনার অধীনে যেকোনো ব্যাংক বা ঋণগ্রহীতা আনুষ্ঠানিক আইনি লড়াইয়ে যাওয়ার আগেই কোনো মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হতে পারবেন। তবে এই আলোচনার জন্য উভয় পক্ষের সুস্পষ্ট সম্মতি প্রয়োজন হবে। শুধু নতুন তৈরি হওয়া বিরোধই নয়, যেসব খেলাপি ঋণের মামলা ইতিমধ্যে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রেও পক্ষগুলো পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারবে।
প্রকাশিত নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে হলে ‘সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট ১৮৬০’, ‘পার্টনারশিপ অ্যাক্ট ১৯৩২’ অথবা ‘কোম্পানি আইন ১৯৯৪’-এর যেকোনো একটির অধীনে নিবন্ধিত হতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স ও আয়কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকার পাশাপাশি আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের অন্তত তিন বছরের পেশাগত কাজের অভিজ্ঞতা এবং নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী থাকা আবশ্যক। স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বলা হয়েছে যে, কোনো ঋণখেলাপি, দেউলিয়া, দুর্নীতি বা মানি লন্ডারিংয়ের মতো অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তি বা তাঁদের প্রতিষ্ঠান এতে যুক্ত হতে পারবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক দাখিলকৃত নথি ও পরিদর্শনের ভিত্তিতে ১০০ নম্বরের মূল্যায়নে অন্তত ৭০ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাথমিকভাবে তিন বছরের জন্য অনুমোদন দেবে।
এই মধ্যস্থতা প্রক্রিয়াকে পেশাদার ও নিরপেক্ষ রাখতে প্রতিটি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য কমপক্ষে ৫ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই প্যানেলে অন্তত একজন সনদপ্রাপ্ত হিসাববিদ ও একজন আইন বিশেষজ্ঞ থাকতে হবে, যাঁদের সংশ্লিষ্ট খাত বা বিবাদ নিষ্পত্তিতে ন্যূনতম ১০ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। একই সঙ্গে পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও প্রভাবমুক্ত রাখতে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তিকে মধ্যস্থতাকারী প্যানেলে যুক্ত করা যাবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা এই নীতিমালার মূল শর্ত, যোগ্যতা ও প্রশাসনিক নিয়মগুলো একনজরে দেখে নেওয়া যাক:
| মানদণ্ড ও বিষয়াবলী | বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত নীতি ও নির্দেশিকা |
| আইনি ভিত্তি | ১৮৬০ সালের সোসাইটিজ অ্যাক্ট, ১৯৩২ সালের পার্টনারশিপ অ্যাক্ট বা ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনে নিবন্ধিত হতে হবে |
| পেশাগত অভিজ্ঞতা | আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম ৩ বছরের ব্যবসায়িক বা পেশাগত অভিজ্ঞতার সনদ প্রয়োজন |
| আর্থিক সক্ষমতা | বিগত ৩ বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী ও একক স্বতন্ত্র ব্যাংক হিসাব পরিচালন বাধ্যতামূলক |
| যোগ্যতা নম্বর | কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্বিক মূল্যায়নে ১০০ নম্বরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৭০ নম্বর পেতে হবে |
| মেয়াদের সীমা | অনুমোদিত তালিকাভুক্তির মেয়াদ হবে ৩ বছর (মেয়াদ শেষের ৯০ দিন আগে নবায়নের আবেদন করতে হবে) |
| প্যানেল গঠন | প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নূন্যতম ৫ সদস্য সমন্বয়ে মধ্যস্থতাকারী বিশেষজ্ঞ প্যানেল রাখতে হবে |
| বিশেষজ্ঞ সদস্য | প্যানেলে অন্তত ১ জন হিসাববিদ ও ১ জন আইন বিশেষজ্ঞ থাকা আইনিভাবে আবশ্যক |
| অভিজ্ঞতার শর্ত | প্যানেলের সদস্যদের আইন, হিসাবরক্ষণ, ব্যাংকিং বা বিচারকার্যে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে |
| অযোগ্যতার কারণ | ঋণখেলাপি, দেউলিয়া, মানি লন্ডারিং বা কোনো ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হওয়া |
| রাজনৈতিক বিধিনিষেধ | রাজনৈতিক প্রভাব থাকা যেকোনো ব্যক্তিকে প্যানেল সদস্য করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ |









