জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

বিশ্বকাপে অসদাচরণ ও বিতর্কিত ব্যানার: ৩ অজিফুটবলার নিষিদ্ধ, আর্জেন্টিনাকে বিপুল জরিমানা ফিফার

স্পেনের বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচ শেষে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘাত এবং ইংল্যান্ডকে হারানোর পর রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ব্যানার প্রদর্শনের ঘটনায় কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিফা। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির ডিসিপ্লিনারি কমিটি আর্জেন্টিনার তিন তারকা ফুটবলার ও এক কোচিং স্টাফের সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি দেশের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে (এএফএ) বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানা করেছে।

ফাইনাল ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পরপরই দুপক্ষের খেলোয়াড়দের মধ্যে অপ্রীতিকর বাগবিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। সেই সংঘর্ষের ঘটনায় সবচেয়ে কঠোর শাস্তির কবলে পড়েছেন আর্জেন্টিনার নির্ভরযোগ্য মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেস। তাঁকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ১০ ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং সঙ্গে ৯০ হাজার মার্কিন ডলার দণ্ড দেওয়া হয়েছে। রক্ষণভাগের শক্ত স্তম্ভ নাহুয়েল মোলিনাকে পোহাতে হচ্ছে সাত ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা এবং তাঁকেও সমান ৯০ হাজার ডলার জরিমানা দিতে হবে। অন্যদিকে, তরুণ প্রতিভাবান অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার থিয়াগো আলমাদাকে এক ম্যাচ নিষেধাজ্ঞা ও ৩০ হাজার ডলার জরিমানা করা হয়েছে। মাঠের খেলোয়াড়দের পাশাপাশি আর্জেন্টিনা দলের ডাগআউটের সদস্য ও সাবেক কিংবদন্তি রবার্তো আয়ালাকেও ছেড়ে দেয়নি ফিফা; তাঁকে তিন ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি ৩০ হাজার ডলার জরিমানা করা হয়েছে। ফাইনালের সেই একই অনাকাঙ্ক্ষিত হাতাহাতিতে জড়ানোর দায়ে স্পেনের মধ্যমাঠের খেলোয়াড় গাভিকেও এক ম্যাচ নিষেধাজ্ঞা ও ৩০ হাজার ডলার দণ্ড দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বকাপের মাঠে শুধু ফাইনালেই নয়, সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর আর্জেন্টিনা শিবিরের কর্মকাণ্ড নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। জয় উদযাপনের সময় আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের হাতে একটি ব্যানার দেখা যায়, যেখানে স্প্যানিশ ভাষায় লেখা ছিল—’Las Malvinas son Argentinas’, যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার’। আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়মে রাজনৈতিক বার্তা বা প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এই ব্যানার প্রদর্শনের দায়ে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে (এএফএ) মোট ৩ লাখ ২১ হাজার মার্কিন ডলারের জরিমানা হাঁকিয়েছে ফিফা।

এই ৩ লাখ ২১ হাজার ডলার জরিমানার হিসাব বেশ সুনির্দিষ্ট। এর মধ্যে কেবল বিতর্কিত ব্যানার প্রদর্শনের জন্যই জরিমানা করা হয়েছে ১০ হাজার ডলার। গ্যালারিতে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের অসংলগ্ন ও অনুপযুক্ত আচরণের জন্য ধরা হয়েছে আরও ২০ হাজার ডলার। বাকি বিপুল অঙ্কের অর্থ যোগ হয়েছে টুর্নামেন্টের বিভিন্ন ম্যাচে দর্শকদের ফিফার বৈষম্যবিরোধী আচরণবিধি ভঙ্গের কারণে। গ্যালারিতে বারবার বর্ণবাদী ও বৈষম্যমূলক স্লোগান দেওয়ার শাস্তি হিসেবে আর্জেন্টিনাকে তাদের পরবর্তী হোম ম্যাচটি ৫০ শতাংশ দর্শক ধারণক্ষমতা নিয়ে খেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আরও একটি ম্যাচে একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া থাকলেও তা শর্তসাপেক্ষে স্থগিত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া জরিমানার অঙ্ক থেকে ১ লাখ ডলারও আপাতত স্থগিত রেখেছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থাটি।

ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার ঐতিহাসিক বিরোধ বহু পুরোনো। দক্ষিণ আটলান্টিকের এই দ্বীপপুঞ্জটি যুক্তরাজ্যের একটি স্বায়ত্তশাসিত ভৌগোলিক অংশ (ওভারসিজ টেরিটরি) হিসেবে বিবেচিত। ১৯৮২ সালে তৎকালীন আর্জেন্টাইন সামরিক সরকার দ্বীপপুঞ্জটির ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে সেনা অভিযান চালায়, তবে টানা সামরিক লড়াইয়ের পর ওই বছরের জুনে আর্জেন্টাইন বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত এক ঐতিহাসিক গণভোটে ফকল্যান্ডের প্রায় শতভাগ অধিবাসী যুক্তরাজ্যের প্রশাসনিক অধীনে থাকার পক্ষেই স্পষ্টভাবে রায় দেন।

বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে ফুটবলারদের এমন বিতর্কিত ব্যানার প্রদর্শনের তীব্র প্রতিবাদ এসেছিল ব্রিটিশ রাজনৈতিক মহল থেকেও। যুক্তরাজ্যের লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা এড ডেভি জড়িত খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে শাস্তিমূলক বয়কটের দাবি তুলেছিলেন। এমনকি তৎকালীন ব্রিটিশ ব্যবসা ও বাণিজ্যবিষয়ক মন্ত্রী পিটার কাইল ঘটনাটিকে ‘সম্পূর্ণ অশোভন ও অনুপযুক্ত খেলাধুলার আচরণ’ বলে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

এদিকে ফিফার এই কঠোর দণ্ডাদেশের পর হাত গুটিয়ে বসে নেই আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটির রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি ও যৌক্তিক কারণগুলো সংগ্রহের জন্য তাদের আইন বিভাগ কাজ শুরু করেছে। সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করে উচ্চতর আপিল কমিটির কাছে আবেদন জানানোর আইনগত সুযোগ রয়েছে এমন শাস্তিগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত আপিল করা হবে। যদি সেখানেও আশানুরূপ ফল না আসে, তবে শেষ পদক্ষেপ হিসেবে ক্রীড়া অঙ্গনের সর্বোচ্চ আদালত ‘কোর্ট অব আরবিট্রেশন ফর স্পোর্টস’ (সিএএস)-এ লড়াই করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর