জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

দেশের স্বার্থে আমৃত্যু লড়েছেন তৌফীক নাওয়াজ

বনানী কবরস্থানে বাবা আমিনর রহমানের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন আইনজীবী, বাঁশিবাদক ও ক্রিকেটপ্রেমী তৌফীক নাওয়াজ। আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী দীপু মনির স্বামী তৌফীক নাওয়াজ মঙ্গলবার রাতে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।

বৃহস্পতিবার বাদ জোহর গুলশানের আজাদ মসজিদে তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। পরে বেলা পৌনে ৩টার দিকে বৃষ্টির মধ্যে বনানী কবরস্থানে বাবা আমিনর রহমানের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়। কাছেই রয়েছে তার মা খায়রন নেছার কবর।

তৌফীক নাওয়াজের পরিচয় কেবল একজন আইনজীবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ঘনিষ্ঠজনদের বর্ণনায় তিনি ছিলেন স্বল্পভাষী ও প্রচারবিমুখ একজন মানুষ। পেশাগত ব্যস্ততার বাইরে বাঁশি বাজানো ছিল তার অন্যতম প্রিয় কাজ। ক্রিকেটের প্রতিও তার আগ্রহ ছিল।

শৈশবের বন্ধু আইনজীবী ও রাজনীতিক মহসিন রশীদ জানান, তৌফীক নাওয়াজের পরিবারের সঙ্গে বাঁশির সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। তার বাবা আমিনর রহমানও বাঁশি বাজাতেন। পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মেও সেই চর্চা অব্যাহত ছিল। তৌফীক নাওয়াজ নিজেও নিয়মিত বাঁশি বাজাতেন এবং একক বাঁশিবাদনের অনুষ্ঠানও করেছিলেন।

রাজধানীর সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলে তার শিক্ষাজীবনের শুরু। তৃতীয় শ্রেণি থেকে মহসিন রশীদের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ও সহপাঠীজীবন। দেশে প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর তিনি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করেন। সেখানে আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে তিনি ড. কামাল হোসেনের আইন কার্যালয়ে পেশাজীবন শুরু করেন।

দীর্ঘ আইনজীবী জীবনে তৌফীক নাওয়াজ দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সক্রিয় ছিলেন বলে জানান তার দীর্ঘদিনের বন্ধুরা। মহসিন রশীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণের আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়েও তৌফীক নাওয়াজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। দেশের স্বার্থে আইনি অঙ্গনে তিনি সব সময় সক্রিয় থাকার চেষ্টা করেছেন বলেও জানান তার বন্ধু।

তৌফীক নাওয়াজের সহপাঠীদের কয়েকজন বৃহস্পতিবার তার জানাজায় অংশ নেন। তাদের মধ্যে মহসিন রশীদ ছাড়াও ছিলেন সৈয়দ আশরাফুল হক ও মনিরুল আলম। এক সহপাঠী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তৌফীক নাওয়াজ ছিলেন সৎ ও ভালো মানুষ।

জীবনের শেষ কয়েক বছর অবশ্য কঠিন শারীরিক অসুস্থতার মধ্য দিয়ে কাটাতে হয়েছে তাকে। দীর্ঘদিন ধরে কিডনি ও যকৃতের নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। ২০১৯ সালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে শারীরিকভাবে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েন। অসুস্থতার পরও তার বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা অটুট ছিল বলে ঘনিষ্ঠজনেরা জানান।

সর্বশেষ গত ২৭ মে স্বজনেরা তাকে হুইলচেয়ারে করে আদালত প্রাঙ্গণে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি কারাবন্দি স্ত্রী দীপু মনির সঙ্গে দেখা করেন। সেটিই ছিল স্বামী-স্ত্রীর শেষ সাক্ষাৎগুলোর একটি।

তৌফীক নাওয়াজের মৃত্যুর সময় দীপু মনি বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে মুন্সীগঞ্জ কারাগারে ছিলেন। স্বামীর শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে তাকে ১২ ঘণ্টার জন্য শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয়।

বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে তাকে মুন্সীগঞ্জ কারাগার থেকে প্রহরায় ঢাকায় আনা হয়। সকাল সোয়া ৮টার দিকে তিনি কলাবাগানের বাসায় পৌঁছান। একই সময়ে তৌফীক নাওয়াজের মরদেহও ওই বাসায় নেওয়া হয়। পরে মরদেহ রাখা হয় শীতাতপনিয়ন্ত্রিত মরদেহবাহী গাড়িতে।

বাসার নিচে মরদেহ রাখা অবস্থায় স্থানীয় মসজিদের মুয়াজ্জিনসহ কয়েকজন কোরআন তেলাওয়াত করেন। পুরো এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার ছিল। বাসায় যাওয়া ব্যক্তিদেরও নিরাপত্তাকর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়।

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বামীর মৃত্যুতে দীপু মনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। সকালে তিনি খুব কম কথা বলছিলেন এবং খাবারও গ্রহণ করতে চাইছিলেন না। তাকে সান্ত্বনা দিতে স্বজন ও পরিচিতজনেরা বাসায় যান।

বেলা সোয়া ১২টার পর তৌফীক নাওয়াজের মরদেহ নিয়ে মরদেহবাহী গাড়ি গুলশানের আজাদ মসজিদের উদ্দেশে রওনা হয়। কিছুক্ষণ পর দীপু মনিকেও প্রহরায় সেখানে নেওয়া হয়।

জানাজার সময় তিনি গাড়ির ভেতরেই ছিলেন। জানাজা শেষ হওয়ার পর গাড়ি থেকে নেমে শেষবারের মতো স্বামীর মরদেহ দেখেন তিনি। সেই মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত স্বজন ও পরিচিতজনদের মধ্যে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

এরপর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বনানী কবরস্থানে। বৃষ্টির মধ্যেই বাবা আমিনর রহমানের কবরের পাশে তৌফীক নাওয়াজকে দাফন করা হয়। দাফনের সময় উপস্থিত ছিলেন দীপু মনি ও পরিবারের সদস্যরা। তাদের মেয়ে দ্বীপান্বিতা নাওয়াজ বাবার কবরে মাটি দেন।

দাফন শেষে মোনাজাতে অংশ নেন দীপু মনি, পরিবারের সদস্য, বন্ধু, স্বজন এবং উপস্থিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। বনানী কবরস্থান মসজিদের ইমাম মাওলানা ওমর ফারুক মোনাজাত পরিচালনা করেন। পরে দীপু মনি ইমামের সঙ্গে কথা বলে স্বামীর জন্য দোয়া কামনা করেন।

স্বামীকে দাফনের পর দীপু মনি তার বাবা এম এ ওয়াদুদের কবরও জিয়ারত করেন। ওয়াদুদ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ছিলেন। কবর জিয়ারত শেষে বৃষ্টির মধ্যেই তাকে আবার কারাগারে নেওয়া হয়।

মুন্সীগঞ্জের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দা নুরমহল আশরাফীর তথ্য অনুযায়ী, প্যারোলে মুক্তির নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টা ৫৮ মিনিটে দীপু মনিকে মুন্সীগঞ্জ কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

তৌফীক নাওয়াজের জীবন তাই একাধিক পরিচয়ের সমন্বয়—আইন পেশায় নিষ্ঠাবান একজন মানুষ, নিভৃতচারী বাঁশিবাদক, ক্রিকেটপ্রেমী এবং দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট আইনি লড়াইয়ে সক্রিয় এক আইনজীবী। মৃত্যুর পর বনানীর মাটিতে শায়িত হওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হলো তার দীর্ঘ কর্মময় জীবনের অধ্যায়।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর