দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৮ আগস্ট দেশের মোট বা গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৭ দশমিক ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নির্ধারিত বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করলে একই সময়ে দেশের রিজার্ভের পরিমাণ ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার।
সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের এই বৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য স্বস্তির একটি বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রিজার্ভ শক্তিশালী থাকলে আমদানি ব্যয় মেটানো, আন্তর্জাতিক দায় পরিশোধ এবং বৈদেশিক লেনদেনের প্রয়োজনীয় অর্থ জোগানের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা বাড়ে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ও কাঁচামাল আমদানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। শিল্পের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল, জ্বালানি, খাদ্যপণ্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্য নিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়। ফলে রিজার্ভের পর্যাপ্ততা শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবের একটি সংখ্যা নয়; এর সঙ্গে দেশের আমদানি সক্ষমতা, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
তবে গ্রস রিজার্ভ এবং বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ১৮ আগস্ট গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩৭ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিপিএম৬ হিসাব কাঠামো অনুযায়ী রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। দুটি হিসাবের পদ্ধতি এক নয় বলে পরিমাণেও পার্থক্য দেখা যায়। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিপিএম৬ হিসাবটি আন্তর্জাতিক তুলনার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
রিজার্ভ বাড়ার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ব্যবস্থাপনাতেও কিছুটা স্বস্তি তৈরি হতে পারে। আমদানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা, আন্তর্জাতিক লেনদেন এবং বিভিন্ন বৈদেশিক দায় পরিশোধের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত মজুত কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষমতা দেয়। একই সঙ্গে রিজার্ভের স্থিতিশীলতা বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে আস্থার পরিবেশ তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এক দিনের রিজার্ভের পরিমাণ দিয়ে দেশের বৈদেশিক খাতের পুরো পরিস্থিতি বিচার করা ঠিক হবে না। রিজার্ভের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নির্ভর করে রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয়, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ, ঋণ পরিশোধ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক লেনদেনের ওপর। এসব খাতে আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্যই শেষ পর্যন্ত রিজার্ভের গতিপথ নির্ধারণ করে।
বিশেষ করে প্রবাসী আয় ও রপ্তানি থেকে নিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশে প্রবেশ করলে রিজার্ভ ধরে রাখা সহজ হয়। বিপরীতে আমদানি ব্যয় দ্রুত বাড়লে কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার বহিঃপ্রবাহ বেড়ে গেলে রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তাই বর্তমান বৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও এই প্রবণতা কতটা স্থায়ী হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
১৮ আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, ৩৭ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারের গ্রস রিজার্ভ এবং বিপিএম৬ পদ্ধতিতে ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের সাম্প্রতিক অবস্থান তুলে ধরছে। সামনে রপ্তানি, প্রবাসী আয়, আমদানি ও বৈদেশিক দায়ের গতিপথ রিজার্ভের পরবর্তী অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বৈদেশিক মুদ্রার আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হলে বর্তমান ইতিবাচক প্রবণতা আরও স্থিতিশীল হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।









