নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে রাজধানীতে বিশেষ ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ চালু করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন। তবে উদ্বোধনের পরদিনই এই সেবার বাস্তব চিত্রে দেখা গেল ভিন্নতা। নির্ধারিত রুটে চলাচল করা বাসে অধিকাংশ আসন ফাঁকা ছিল, কোথাও হাতে গোনা কয়েকজন নারী যাত্রী নিয়েই বাস চলতে দেখা গেছে।
অন্যদিকে একই সময়ে রাজধানীর প্রচলিত গণপরিবহনে নারীদের উপস্থিতি ছিল যথেষ্ট। কর্মজীবী ও অন্যান্য গন্তব্যের যাত্রীরা নিয়মিত বাসেই ওঠার চেষ্টা করেছেন। কোথাও কোথাও অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে নারী যাত্রীদের বাসের দরজায় দাঁড়িয়ে বা ঝুলে যাতায়াত করতেও দেখা গেছে।
বুধবার সকাল ৯টার পর রাজধানীর শ্যামলী বাস পয়েন্ট অতিক্রম করে মিরপুর-১০ থেকে মতিঝিলের উদ্দেশে যাওয়া একটি মহিলা বাস সার্ভিস। বাইরে থেকে দেখা যায়, বাসটির দোতলার প্রায় সব আসনই ফাঁকা। নিচতলায় ছিলেন মাত্র চার থেকে পাঁচজন নারী যাত্রী। পুরো বাসে যাত্রীসংখ্যা ছিল খুবই কম।
বাসটির পেছনের দরজার কাছে একজন পুরুষ যাত্রী এবং চালকের সহকারীর আসনে একজন পুরুষকেও দেখা যায়। শ্যামলী থেকে বাসটির গতিপথ অনুসরণ করে দেখা যায়, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট অতিক্রম করলেও নতুন করে যাত্রী ওঠানামার দৃশ্য চোখে পড়েনি। আড়ং ট্রাফিক সিগন্যাল পেরিয়ে সংসদ ভবন পর্যন্ত বাসটির যাত্রায়ও উল্লেখযোগ্য যাত্রীসংখ্যা দেখা যায়নি। যাত্রী সংকটের কারণে বাসটি কোথাও দীর্ঘ সময় না থামায় চালক বা সহকারীর বক্তব্য নেওয়াও সম্ভব হয়নি।
নারী যাত্রী থাকলেও অপেক্ষা কম
মহিলা বাস সার্ভিস চালুর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো নারীদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াতের সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু বাসস্টপগুলোতে নারী যাত্রী থাকলেও নতুন এই সেবার জন্য আলাদা করে অপেক্ষা করার প্রবণতা প্রথম দিনেই খুব একটা দেখা যায়নি।
ফার্মগেটে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত অবস্থান করেও মহিলা বাস সার্ভিসের দেখা পাওয়া যায়নি। সেখানে নিয়মিত বাসের অপেক্ষায় থাকা নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্দিষ্ট সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা তাদের কাছে বড় বিষয়। তাই কোনো বিশেষ বাসের অপেক্ষায় দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার ঝুঁকি নিতে অনেকেই আগ্রহী নন।
ফার্মগেটে অপেক্ষমাণ নারী যাত্রী আসমা আক্তার বলেন, তিনি প্রতিদিনের মতো কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য বাসের অপেক্ষা করছেন। নির্দিষ্ট মহিলা বাসের ওপর নির্ভর করলে সেটি কখন আসবে, আর সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছানো যাবে কি না—তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে অপেক্ষার সময় মহিলা বাস পেলে তিনি তাতে উঠবেন বলে জানান।
আরেক যাত্রী সোনালী খাতুন জানান, প্রায় আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তিনি মহিলা বাসের দেখা পাননি। তাঁর মতে, উদ্যোগটি ভালো হলেও বাসের সংখ্যা কম থাকলে কর্মঘণ্টার সময়ে শুধু এই সেবার ওপর নির্ভর করা কঠিন হবে। নিয়মিত ও নির্দিষ্ট ব্যবধানে বাস চালানোর পাশাপাশি সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।
ঢাকায় ৯ রুটে ১০ বাস
নারীদের যাতায়াতের সুবিধা বাড়াতে প্রাথমিকভাবে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোকে যুক্ত করে মহিলা বাস সার্ভিসের রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকার ৯টি রুটে ১০টি বাস দিয়ে এই সেবা শুরু হয়েছে। এসব বাসে চালক ও কন্ডাক্টর হিসেবে নারী কর্মীদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীতে বাসগুলো সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলার কথা। নির্ধারিত রুটগুলোতে মোট ১১৪টি স্টপেজ রাখা হয়েছে। ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও বগুড়াতেও এই উদ্যোগের আওতায় মোট চারটি বাস চালু করা হয়েছে।
উদ্যোগটির মূল লক্ষ্য শুধু নারীদের জন্য আলাদা পরিবহন চালু করা নয়, বরং গণপরিবহনে তাদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য বাড়ানো। বিশেষ করে কর্মজীবী নারী, শিক্ষার্থী এবং নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রীদের জন্য এমন সেবা কার্যকর হতে পারে।
তবে প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু বাস চালু করলেই যাত্রীদের অভ্যাস বদলানো সহজ হবে না। কোন রুটে কখন বাস পাওয়া যাবে, অপেক্ষার সময় কতটা, নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাতে কত সময় লাগবে—এসব বিষয় যাত্রীদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বর্তমানে সীমিত সংখ্যক বাস দিয়ে শুরু হওয়ায় অনেক নারী নিয়মিত গণপরিবহনেই যাতায়াত করছেন। ফলে নতুন সেবাটিকে জনপ্রিয় করতে পর্যাপ্ত বাস, নির্দিষ্ট সময়সূচি এবং নিয়মিত পরিচালনা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠেছে। মহিলা বাস সার্ভিস কতটা কার্যকর ও টেকসই হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে এসব বাস্তব সমস্যার সমাধানের ওপর।









