জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

সীতাকুণ্ডে শিপ ইয়ার্ডে শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা: বুয়েট বিশেষজ্ঞদের তদন্ত শুরু

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে নয় শ্রমিকের মৃত্যুর তিন দিন পরও দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজে সরাসরি তদন্ত শুরু করতে পারেনি আগের তিন তদন্ত কমিটি। জাহাজের ভেতরে এখনো বিষাক্ত গ্যাস থাকার আশঙ্কা এবং এর মাত্রা ও প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত না হওয়ায় তদন্তকারীদের সেখানে প্রবেশের ঝুঁকি নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি বিবেচনায় এবার বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের একজন অধ্যাপকের নেতৃত্বে আট সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল গঠন করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়।

সোমবার থেকে বিশেষজ্ঞ দলটি দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে কাজ শুরু করেছে। জাহাজের কোন কোন অংশে গ্যাস জমে আছে, গ্যাসের ধরন ও পরিমাণ কত, কোথা থেকে গ্যাস বের হয়েছে এবং সেই লিকেজ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখবে দলটি। পাশাপাশি জাহাজটিকে নিরাপদভাবে গ্যাসমুক্ত করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশও দেওয়া হবে। তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বিশেষজ্ঞ দলকে।

বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার পর থেকেই জাহাজটির ভেতরে গ্যাসের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে হাইড্রোজেন সালফাইডের মতো অত্যন্ত বিষাক্ত গ্যাসের আশঙ্কা থাকায় সাধারণ তদন্ত কার্যক্রমও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এই গ্যাস বাতাসের তুলনায় ভারী হওয়ায় জাহাজের নিচের অংশ, চেম্বার বা আবদ্ধ স্থানে জমে থাকতে পারে। ফলে বাইরে থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে প্রবেশকারী ব্যক্তির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

দুর্ঘটনার দিন শুক্রবার শিল্প মন্ত্রণালয় ১১ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। অতিরিক্ত সচিব এ কে এম বেনজামিন রিয়াজীকে কমিটির প্রধান করা হয়। একই দিনে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হককে প্রধান করে নয় সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনও সেদিন তিন সদস্যের একটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে।

তবে জাহাজের ভেতরে বিপজ্জনক মাত্রায় গ্যাস থাকার আশঙ্কায় এসব কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থলের মূল অংশে প্রবেশ করতে পারেননি। ফলে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ, গ্যাসের উৎস কিংবা কোন প্রক্রিয়ায় বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়েছিল—এসব বিষয়ে সরেজমিনে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ সম্ভব হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে রোববার সন্ধ্যায় শিল্প মন্ত্রণালয় বিশেষায়িত আট সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল গঠন করে। দলের নেতৃত্বে রয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. ইয়াসির আরাফাত খান। কমিটিতে বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক ক্যাপ্টেন মো. শোয়েব আহমদ এবং বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক মুহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খানসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা রয়েছেন।

বিশেষজ্ঞ দল গঠনের আগে সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রশাসনও শিল্প মন্ত্রণালয়ের কাছে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানায়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম রোববার বিকেলে শিল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে জানান, দুর্ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস, বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ঘটনাস্থলে কাজ করছে। কিন্তু গ্যাসের সুনির্দিষ্ট উৎস ও কারণ তখনও নির্ধারণ করা যায়নি। গ্যাসের লিকেজ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়েছে কি না, জাহাজের ভেতরে অন্য কোনো বিপজ্জনক গ্যাস রয়েছে কি না এবং থাকলে তার পরিমাণ কত—এসব বিষয়ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গ্যাসের ঝুঁকির কারণে দুর্ঘটনাস্থল থেকে নমুনা সংগ্রহ করাও সম্ভব হয়নি। ফলে বিশেষজ্ঞদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গ্যাস শনাক্তকরণ ও দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণ এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার প্রথম আলোকে জানান, রোববার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জাহাজটির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। যেসব চেম্বারে এখনো গ্যাস থাকার আশঙ্কা রয়েছে, সেগুলো শনাক্ত করা, গ্যাসের প্রকৃতি ও পরিমাণ নির্ধারণ, লিকেজের উৎস চিহ্নিত করা এবং তা বন্ধের উপায় সম্পর্কে সুপারিশ তৈরির জন্যই বিশেষজ্ঞ দলটি কাজ করছে।

তিনি জানান, তদন্তের আগে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো নিরাপদ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন হলে দেশীয় কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুসরণ করে জাহাজটি গ্যাসমুক্ত করার কাজে যুক্ত করা হতে পারে।

দুর্ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার সকাল নয়টার দিকে ভাটিয়ারীর স্টেশন রোড এলাকায় ফেরদৌস স্টিল কারখানায়। স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে নয় শ্রমিক মারা যান। প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় জাহাজের একটি ট্যাংক কাটার কাজ চলছিল। কাজটি প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছানোর সময় ট্যাংক থেকে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার পর শ্রমিকেরা আক্রান্ত হন।

এখন তদন্তের মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—জাহাজে কী ধরনের গ্যাস জমেছিল, সেটি কোথা থেকে বের হয়েছিল এবং জাহাজ কাটার আগে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না। বিশেষজ্ঞ দলের সরেজমিন তদন্ত এবং গ্যাসের নমুনা বিশ্লেষণের পর এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে এ ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঠেকাতে কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন, সেই বিষয়টিও তদন্ত প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেতে পারে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর