জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

৫৪ রানে অলআউট থেকে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো, বাংলাদেশের জয় নিয়ে গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইনে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক টেস্ট জয়কে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অন্যতম বড় অঘটন হিসেবে তুলে ধরেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের এই সাফল্যের গুরুত্ব শুধু অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলকে হারানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রায় অনভিজ্ঞ একটি দল যেভাবে চার দিন ধরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে জয় তুলে নিয়েছে, সেটিই ঘটনাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করেছে।

বাংলাদেশের জন্য জয়টি ছিল নয় উইকেটের। এর চেয়েও বড় বিষয়, পুরো ম্যাচে দলটি একটিও সেশন হারেনি। ডারউইনের কঠিন কন্ডিশনে ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে ধারাবাহিকভাবে ভালো ক্রিকেট খেলেছে। বিশ্লেষক জিওফ লেমন বাংলাদেশের এই পারফরম্যান্সকে এমন এক সাফল্য হিসেবে দেখেছেন, যা দুই দলের সামর্থ্য ও অভিজ্ঞতার প্রচলিত হিসাবকে কার্যত উল্টে দিয়েছে।

অথচ টেস্টের আগে বাংলাদেশের প্রস্তুতির চিত্র ছিল একেবারেই ভিন্ন। মূল ম্যাচের আগে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার উদীয়মান খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া দলের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয়েছিল বাংলাদেশ। এমন ব্যাটিং বিপর্যয়ের পর অস্ট্রেলিয়ার মূল দলের বিপক্ষে টেস্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সেই ধাক্কা সামলে বাংলাদেশ মূল ম্যাচে সম্পূর্ণ ভিন্ন চেহারায় হাজির হয়।

অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণের অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশের জন্য বড় পরীক্ষা ছিল। প্রতিপক্ষের চার বোলারের সম্মিলিত টেস্ট উইকেটের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৬০০-এর বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশের অনেক খেলোয়াড়েরই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতা ছিল সীমিত। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপ দলের কয়েকজন খেলোয়াড় ছাড়া অধিকাংশ ক্রিকেটারের জন্য অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশন ছিল তুলনামূলক অপরিচিত।

এই ব্যবধানই বাংলাদেশের জয়কে আরও বিস্ময়কর করে তুলেছে। অস্ট্রেলিয়ার খেলোয়াড়েরা বাংলাদেশকে হালকাভাবে নিয়েছিলেন—এমন ব্যাখ্যাও খুব সহজে দাঁড় করানো যায় না। ম্যাচের আগে বা খেলার সময় তাদের আচরণে আত্মতুষ্টির স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের ভুল শট নির্বাচন, ভুল লাইনে খেলা এবং বাংলাদেশের বোলারদের সামনে বারবার চাপের মুখে পড়াই পরাজয়ের বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশের বোলাররা শুরু থেকেই পরিকল্পিতভাবে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংকে চাপে রাখেন। প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেওয়ার পর বাংলাদেশের ব্যাটাররা পরিস্থিতির পূর্ণ সুবিধা নেন। তানজিদ হাসান নিজের প্রথম টেস্ট শতক করেন। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তও গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন। দলের প্রথম ইনিংসের লিড অস্ট্রেলিয়ার ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।

দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও বাংলাদেশ আবারও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট তুলে নেয়। হাসান মাহমুদ ম্যাচে নয়টি উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের জয়ে বড় ভূমিকা রাখেন এবং ম্যাচসেরার স্বীকৃতি পান। মেহেদী হাসান মিরাজও দ্বিতীয় ইনিংসে কার্যকর বোলিং করে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করেন। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য পেয়ে বাংলাদেশ এক উইকেট হারিয়ে সেটি অতিক্রম করে।

বাংলাদেশের এই জয় দুই দেশের টেস্ট ইতিহাসের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর ২৬ বছরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ মাত্র ছয়টি টেস্ট খেলেছে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এর আগে দুই দলের মধ্যে টেস্ট হয়েছে মাত্র দুবার। ফলে নিয়মিত মুখোমুখি হওয়ার সুযোগের অভাবও বাংলাদেশের উন্নতির পথে একটি বড় বাস্তবতা ছিল।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বৃহত্তর কাঠামোর দিকে প্রশ্ন তুলেছে। সম্ভাবনাময় দলগুলো যদি শীর্ষ দলগুলোর বিপক্ষে নিয়মিত খেলার সুযোগ না পায়, তাহলে তাদের উন্নতির গতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ডারউইনের জয় দেখিয়েছে, সুযোগ পেলে বাংলাদেশ বড় দলের বিরুদ্ধেও নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করতে পারে।

এই জয়ের ফলে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অবস্থানেও পরিবর্তন এসেছে। অস্ট্রেলিয়াকে শীর্ষস্থান থেকে সরিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। দুই টেস্টের সিরিজের প্রথম ম্যাচে এমন ফল পাওয়ায় ম্যাকেতে অনুষ্ঠেয় দ্বিতীয় টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার ওপর চাপও বেড়েছে। সিরিজ সমতায় ফেরাতে তাদের ঘুরে দাঁড়াতেই হবে।

তবে দ্বিতীয় টেস্টের ফল যাই হোক, ডারউইনের জয় বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। প্রস্তুতি ম্যাচে ৫৪ রানে অলআউট হওয়া দলটি কয়েক দিনের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়াকে নয় উইকেটে হারিয়েছে। এই নাটকীয় পরিবর্তন শুধু একটি ম্যাচ জয়ের গল্প নয়; এটি আত্মবিশ্বাস, প্রস্তুতি, বোলিং শৃঙ্খলা এবং চাপের মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি বড় উদাহরণ।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো এখানেই। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এমন একটি জয় ভবিষ্যতের বড় দলগুলোর বিপক্ষে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে। একই সঙ্গে বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান দলগুলোকে আরও বেশি উচ্চমানের ম্যাচ খেলার সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে সামনে এনেছে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর