জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

দাম কমিয়েও মিলছে না স্বস্তি, ইইউতে পোশাক রপ্তানিতে ধস

বিশ্ববাজারে কম দামে মানসম্মত পোশাক সরবরাহ করে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছিল বাংলাদেশ। তবে বিশ্ববাণিজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শুধু সস্তা দামের ওপর নির্ভর করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাক বাজারে নিজেদের দাপট ধরে রাখা আর সম্ভব হচ্ছে না। পরিসংখ্যান বলছে, তুলনামূলক কম দামে পণ্য বিক্রি করেও বাংলাদেশ যেখানে রপ্তানির প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের দরপতনের সম্মুখীন হচ্ছে, সেখানে দ্বিগুণেরও বেশি দামে পোশাক বিক্রি করে সফলভাবে বাজার ধরে রেখেছে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভিয়েতনাম।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান দপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ইইউভুক্ত দেশগুলো বিশ্ববাজার থেকে সর্বমোট ৪১ বিলিয়ন ইউরোর তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতিসহ নানা কারণে পোশাক আমদানির এই পরিমাণ বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯.৭০ শতাংশ কম। তবে ইউরোপীয় বাজারে পোশাকের সামগ্রিক চাহিদা হ্রাসের এই ধাক্কা সব রপ্তানিকারক দেশের ওপর সমানভাবে পড়েনি; বরং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে ইইউর পোশাক বাজারে একক দেশ হিসেবে চীনের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম শীর্ষ সরবরাহকারীর খেতাব ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। তবে চলতি বছরের প্রথমার্ধে এই বাজারে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। উক্ত মেয়াদের পরিসংখ্যানে দেখা যায়:

  • রপ্তানি আয় হ্রাস: চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ ইইউর বাজারে মোট ৮.৬৪ বিলিয়ন ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬.৪৩ শতাংশ কম।

  • বাজার অংশীদারত্বে পতন: ইইউর সামগ্রিক পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের বাজার হিস্যা বা শেয়ার কমেছে। গত বছরের প্রথমার্ধে বাজারটিতে বাংলাদেশের অংশ ছিল ২২.৭৩ শতাংশ, যা চলতি বছরের প্রথমার্ধে কমে ২১.০৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

  • একক দর ও পরিমাণের পতন: বাংলাদেশ থেকে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৮.২২ শতাংশ। একই সাথে প্রতি কেজি তৈরি পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্য ১৫.২৪ ইউরো থেকে ৮.৯৪ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১৩.৮৮ ইউরোয়।

বাংলাদেশের এই নিম্নমুখী চিত্রের ঠিক বিপরীত অবস্থানে রয়েছে ভিয়েতনাম। চলতি বছরের প্রথমার্ধে ভিয়েতনাম ইইউর বাজারে ২.০৭ বিলিয়ন ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। পরিমাণের দিক থেকে দেশটির রপ্তানি ১১.৫২ শতাংশ কমলেও অর্থের অঙ্কে রপ্তানি আয় ০.৩৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর নেপথ্যে মূল ভূমিকা রেখেছে পণ্যের গড় দর। পর্যালোচনায় দেখা যায়:

  • উচ্চ মূল্যের পোশাক রপ্তানি: ভিয়েতনাম প্রতি কেজি তৈরি পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্য পেয়েছে ২৯.৩২ ইউরো, যা বাংলাদেশের গড় রপ্তানি মূল্যের (১৩.৮৮ ইউরো) দ্বিগুণেরও বেশি।

  • মূল্য বৃদ্ধি: গত এক বছরে ভিয়েতনামের প্রতি কেজি পোশাকের গড় রপ্তানি দর ১৩.৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের দর কমেছে।

বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দামের অস্থিরতার দরুন গত কয়েক মৌসুমে ম্যান-মেড ফাইবার বা কৃত্রিম তন্তুর তৈরি পোশাকের বৈশ্বিক চাহিদা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ভিয়েতনামের তৈরি পোশাক খাত সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়ে কৃত্রিম তন্তুর পোশাক উৎপাদনে আধিপত্য বিস্তার করলেও বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলো এখনো মূলত প্রথাগত সুতির (কটন) পোশাক কেন্দ্রিক উৎপাদনে সীমাবদ্ধ। ফলে কম পরিমাণের পণ্য পাঠালেও ভ্যালু-অ্যাডেড পণ্য হওয়ায় ভিয়েতনামের আয় বেশি হচ্ছে।

এর পাশাপাশি বিশ্বরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির প্রভাবও স্পষ্ট। ইইউর সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) আলোচনা ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের অগ্রগতির কারণে ইউরোপের অনেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ভারতমুখী হচ্ছে। একই সাথে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে দীর্ঘায়িত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট কারখানাগুলোর উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহের অনিশ্চয়তা পোশাক খাতের বড় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের বিকল্প দেশের দিকে ধাবিত করছে।

তবে বছরের মধ্যভাগে কিছু ইতিবাচক লক্ষণও দেখা গেছে। এককভাবে কেবল জুন মাসে ইইউর তৈরি পোশাক আমদানি সামগ্রিকভাবে ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং একই মাসে বাংলাদেশে থেকে ইইউতে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ৬.৫৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। যদিও একক দর ৫.৩১ শতাংশ কমে যাওয়ায় মূল্যের দিক থেকে প্রবৃদ্ধি হয় সামান্য—মাত্র ০.৮৭ শতাংশ।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাজার অংশীদারত্ব ধরে রাখতে এবং শীর্ষ রপ্তানিকারক চীনের সঙ্গে বৈষম্য কমাতে হলে বাংলাদেশকে দ্রুত সস্তা পোশাকের নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে হবে। কৃত্রিম তন্তুর পোশাক তৈরি, অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নিরাপত্তা প্রদান এবং রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনাই এখন বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর