জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

গাজীপুরে গ্যাসসংকটে ৪০০ কারখানার উৎপাদন ব্যাহত

শিল্পঘন গাজীপুরে তীব্র গ্যাসসংকটের কারণে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, স্পিনিং, ডাইংসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানার উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসের চাপ প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকায় জেলার প্রায় ১৫ শতাংশ কারখানা স্বাভাবিক সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। এতে ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ।

রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুরে গাজীপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, গাজীপুরে ছোট-বড় মিলিয়ে তিন হাজারের বেশি শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে আনুমানিক ৪০০ থেকে সাড়ে ৪০০ কারখানায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিল্প পুলিশের পর্যবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে এ পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেছে।

তবে শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক ও কারখানা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে সংকটের প্রভাব আরও তীব্র। কোনো কোনো কারখানায় গ্যাসের চাপ একেবারেই কমে গেলে উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। আবার কোথাও সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালু রাখা গেলেও কিছুক্ষণ পরপর চাপ কমে যাওয়ায় যন্ত্রপাতি বন্ধ করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য প্রস্তুত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বন্ধ হয়ে গেছে কিছু কারখানা

গাজীপুরের কোনাবাড়ির ফুয়াদ স্পিনিং মিলস লিমিটেড গ্যাসসংকটের কারণে ইতোমধ্যে বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে। ১ আগস্ট থেকে কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এতে পাঁচ শতাধিক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

কারখানাটির উপমহাব্যবস্থাপক আজিজুল হক জানান, কয়েক মাস ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। উৎপাদন না থাকলেও কয়েক মাস শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের লোকসান বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ১ আগস্ট কারখানাটি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলে পুনরায় উৎপাদন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

কালিয়াকৈরের সাদমা ফ্যাশন লিমিটেডেও একই সংকট দেখা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল রানা জানান, ডাইং বিভাগে সমস্যাটি সবচেয়ে বেশি। পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ঠিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। ফলে শ্রমিকদের অনেক সময় কাজ বন্ধ রেখে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। চাপ কিছুটা বাড়লে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না।

প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের এজিএম রবিউল ইসলামও গ্যাসসংকটের কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় কারখানার উৎপাদন পরিকল্পনাতেও চাপ তৈরি হয়েছে।

গাজীপুরের পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ডিভাইন টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডও গত বৃহস্পতিবার থেকে বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে কারখানাটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বন্ধের তথ্য যাচাই করছে শিল্প পুলিশ

গ্যাসসংকটের কারণে ঠিক কতটি কারখানা বন্ধ হয়েছে, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ সরকারি তথ্য এখনো তাদের হাতে নেই বলে জানিয়েছেন শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন। তাঁর মতে, কোনো কারখানা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্যাসসংকটকে বন্ধের কারণ হিসেবে উল্লেখ না করলে সেটিকে নিশ্চিতভাবে গ্যাসের কারণে বন্ধ হয়েছে বলে চিহ্নিত করা কঠিন।

তবে রিপন গার্মেন্টসের পক্ষ থেকে শিল্প পুলিশের কাছে একটি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। সেখানে গ্যাসের চাপ কম থাকায় সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ রেখে শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠানোর কথা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে বলা হয়েছে।

শিল্প পুলিশ বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শন করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। কোন এলাকায় কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে, কতটা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং শ্রমিকদের ওপর এর প্রভাব কী—এসব বিষয়ও তারা যাচাই করছে।

সরবরাহ কম, শেষ প্রান্তে বেশি সংকট

গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট গ্যাস বিতরণ কর্মকর্তারা কেন্দ্রীয়ভাবে সরবরাহ কম থাকার কথা জানিয়েছেন। গাজীপুরের শিল্পকারখানাগুলোর চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বিশেষ করে গ্যাস লাইনের শেষ প্রান্তে থাকা কারখানাগুলো বেশি সমস্যায় পড়ছে। চাপ স্বাভাবিক করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কাজ করছে বলেও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

গ্যাসনির্ভর শিল্পে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপের সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে স্পিনিং, ডাইং, টেক্সটাইল ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস না থাকলে যন্ত্রপাতি পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। বারবার উৎপাদন বন্ধ ও চালু করার কারণে সময়ের পাশাপাশি কাঁচামাল, শ্রম ও পরিচালন ব্যয়ের ওপরও চাপ তৈরি হয়।

গ্যাসসংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু কারখানার উৎপাদন কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা কমে যেতে পারে, সাময়িক ছুটি বাড়তে পারে এবং কিছু প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যাহত হলে ক্রেতার নির্ধারিত সময় অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

গাজীপুর দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোর একটি। এখানে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, স্পিনিং, ডাইংসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যেগুলোর সঙ্গে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হলে তার প্রভাব সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ অবস্থায় শিল্প মালিকদের প্রধান দাবি, দ্রুত গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক করে কারখানাগুলোকে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের সুযোগ দেওয়া। শ্রমিকদের দিক থেকেও স্থিতিশীল কর্মপরিবেশ ও কর্মসংস্থান বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে গাজীপুরের শিল্প উৎপাদনে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর