রাজধানী ঢাকার ভয়াবহ যানজট নিরসন এবং পরিবেশবান্ধব যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে সরকার। ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু ও ধলেশ্বরী—এই পাঁচ নদীকে যুক্ত করে প্রায় ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ সার্কুলার নৌপথে আধুনিক ‘ইলেকট্রিক ওয়াটার বাস’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সমন্বিত এ পরিকল্পনায় চারপাশের ৪টি বড় নদীবন্দরের অধীনে মোট ৪৫টি টার্মিনাল ও ল্যান্ডিং স্টেশনকে এই নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হচ্ছে।
বিআইডব্লিউটিসি ও বিআইডব্লিউটিএ-এর যৌথ তত্ত্বাবধানে প্রণীত রোডম্যাপ অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ১১০ কিলোমিটার নৌপথের মধ্যে ৬৩ কিলোমিটারের গভীরতা বর্তমানে ১২ ফুট এবং বাকি ৪৭ কিলোমিটারের গভীরতা প্রায় ৮ ফুট। নৌযান চলাচলের সুবিধার্থে সিরাজচর থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার অংশে ইতোমধ্যে সংরক্ষণমূলক ড্রেজিং চলছে, যার মূল লক্ষ্য গভীরতা ১২ ফুটে উন্নীত করা। পরবর্তী ধাপে বাকি ৩৭ কিলোমিটার অংশকেও পর্যায়ক্রমে গভীর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিগত প্রকল্পের ব্যর্থতা ও লোকসানের খতিয়ান
ঢাকার নদীপথে গণপরিবহন চালুর উদ্যোগ এটিই প্রথম নয়। ২০১০ সালের ২৮ আগস্ট বাদামতলী-গাবতলী রুটে প্রথম ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু হয় এবং পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ২২ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ-টঙ্গী রুটেও এই সেবা বিস্তৃত করা হয়। তবে সঠিক পরিকল্পনা, সংযোগ সড়ক ও অনিয়মিত সেবার কারণে লোকসানের মুখে পড়ে যথাক্রমে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর ও ২০২০ সালের মার্চে দুই রুটেই সার্ভিস সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
আগের প্রকল্পের সার্বিক আর্থিক ও পরিচালনাগত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
মোট প্রস্তুতকৃত ওয়াটার বাস: ১২টি
বাস তৈরিতে মোট ব্যয়: ৯ কোটি ২০ লাখ টাকা
পরিচালনাসহ অন্যান্য ব্যয়: ৩৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা
সেবা থেকে মোট অর্জিত আয়: ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা
প্রকল্পের সার্বিক নিট লোকসান: ৩৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা
বন্ধের প্রধান কারণসমূহ: সড়কপথে দ্রুত যোগাযোগের সুযোগ, বুড়িগঙ্গার মাত্রাতিরিক্ত দূষণ, সদরঘাটের তীব্র যানজট, স্টেশনের সাথে দুর্বল সড়ক সংযোগ, অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং অনিয়ন্ত্রিত বালুবাহী নৌযানের বাধা।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও অবকাঠামোগত অগ্রগতি
পরিবহন ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আগের ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি এড়াতে নির্ভরযোগ্য ফিডার সার্ভিস, ব্যস্ত সময়ে ছোট আকৃতির দ্রুতগামী নৌযানের ব্যবস্থা এবং নদীদূষণ রোধ জরুরি। বুয়েটের পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান এবং জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাতের মতে, সরকারকে মূলত নীতি নির্ধারণ ও তদারকিতে নজর দিতে হবে এবং গণপরিবহন পরিচালনায় বেসরকারি উদ্যোক্তাদের যুক্ত করা উচিত।
ইতোমধ্যে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করতে গাবতলী-সদরঘাট রুটে উচ্চগতির লঞ্চ, ক্যাটামারান ও পর্যটন নৌযান চালুর বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সাথে নৌপথের সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়নে জোর তৎপরতা চলছে:
ওয়াকওয়ে নির্মাণ: ইতোমধ্যেই ২০ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। আরও ৫২ কিলোমিটারের কাজ ৯২ শতাংশ শেষ এবং নতুন ১০০ কিলোমিটারের প্রস্তাব অনুমোদন প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
সীমানা নির্ধারণ: নদী রক্ষায় ৭,১০০টি প্রস্তাবিত সীমানা পিলারের মধ্যে ৬,৩২০টি স্থাপন শেষ হয়েছে।
দখলমুক্তকরণ (২০০৯-২০২৪): ঢাকা নদীবন্দরে ১৭,৮২৯টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে ৫১৯.০৪ একর এবং নারায়ণগঞ্জে ৬,৯৬৩টি উচ্ছেদ করে ৩১৬.০৬ একর নদীতীরের জমি উদ্ধার করা হয়েছে।
দূষণ নিয়ন্ত্রণ: বিআইডব্লিউটিএ-এর চিহ্নিত ৪২৪টি তরল বর্জ্যের উৎসের (যার ২৪৪টি কারখানা) বর্জ্য অপসারণ ও সংশোধনে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
মূলত নদীর নাব্যতা রক্ষা, কার্যকর ফিডার রোড সংযোগ, আধুনিক টার্মিনাল এবং পরিবেশবান্ধব চার্জিং অবকাঠামো সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করা গেলেই নতুন এই ইলেকট্রিক ওয়াটার বাস প্রকল্প রাজধানীর যানজট নিরসনে টেকসই ভূমিকা রাখতে পারবে।









