জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

নবম পে স্কেলের খসড়া মন্ত্রিসভায় ওঠার অপেক্ষায়

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নবম জাতীয় পে স্কেলের খসড়া এখন মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের পর্যায়ে পৌঁছেছে। মন্ত্রিসভা সচিবের নেতৃত্বাধীন সংশ্লিষ্ট সচিব কমিটি খসড়াটির বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে এটিকে নীতিগতভাবে চূড়ান্ত করেছে। এখন প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়া গেলে চলতি সপ্তাহেই মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রস্তাবটি তোলা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

তবে খসড়াটি এখনো চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত নয়। মন্ত্রিসভায় আলোচনার সময় বেতন বৃদ্ধির হার, বাস্তবায়নের সময়সূচি, ভাতা কিংবা অন্যান্য আর্থিক সুবিধার বিষয়ে পরিবর্তন আনার সুযোগ থাকবে। ফলে বর্তমানে আলোচনায় থাকা প্রস্তাবটি অনুমোদনের পর কী রূপ নেয়, সেদিকেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নজর।

মূল বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব

প্রস্তাবিত নবম পে স্কেলের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো মূল বেতন বৃদ্ধি। খসড়া কাঠামোতে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। তবে সব গ্রেডে সমান হারে বেতন বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই। অপেক্ষাকৃত নিম্ন গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য তুলনামূলক বেশি হারে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

এই কাঠামোর পেছনে মূলত নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মীদের ওপর মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ বেড়েছে। ফলে নতুন বেতন কাঠামোয় শুধু বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ নয়, বিভিন্ন স্তরের কর্মীদের আর্থিক অবস্থানের ভারসাম্য রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

দুই ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা

খসড়া পরিকল্পনায় নবম পে স্কেল দুই ধাপে বাস্তবায়নের ধারণা রাখা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে মূল বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পুনর্নির্ধারণ বা বাড়ানোর কথা বিবেচনা করা হচ্ছে।

চলতি বছরের জুলাই থেকে আংশিকভাবে নতুন কাঠামো কার্যকরের সম্ভাবনাও খসড়ায় রাখা হয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে বেতন ও আর্থিক সুবিধার পরিবর্তন বাস্তবায়ন করে ২০২৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে পুরো পে স্কেল কার্যকর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এই সময়সূচি চূড়ান্ত নয়। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পরই বাস্তবায়নের ধাপ ও সময় নির্দিষ্ট হবে।

বিচার বিভাগ নিয়ে আলাদা জটিলতা

নবম পে স্কেলের কাঠামো নির্ধারণে বিচার বিভাগ-সংক্রান্ত কিছু বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। এসব বিষয়ে সমাধান ও সুপারিশ দেওয়ার জন্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে।

বিচার বিভাগ ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট শ্রেণির জন্য বেতন-ভাতা নির্ধারণে সাংবিধানিক, প্রশাসনিক ও আর্থিক বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করতে হয়। ফলে পুরো পে স্কেল চূড়ান্ত করার আগে এসব বিষয় নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। বিশেষ কমিটির মতামত চূড়ান্ত কাঠামোয় কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ।

নবম পে কমিশনের সুপারিশের সঙ্গে পার্থক্য

২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর হওয়ার পর প্রায় এক দশক ধরে নতুন কোনো জাতীয় বেতন কাঠামো চালু হয়নি। এ সময়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি পেলেও সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির পরিবর্তনের কারণে নতুন বেতন কাঠামোর দাবি জোরালো হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে নবম পে কমিশন সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। কমিশনের প্রস্তাবে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ ছিল।

সচিব কমিটির বর্তমান খসড়ায় সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত মূল বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব থাকায় কমিশনের সুপারিশের তুলনায় এটি তুলনামূলকভাবে কম। একই সঙ্গে নিম্ন গ্রেডে বেশি হারে বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি খসড়া কাঠামোর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

সামনে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত

নবম পে স্কেলের ভবিষ্যৎ এখন মূলত মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। খসড়াটি অনুমোদিত হলে কোন গ্রেডে কত হারে বেতন বাড়বে, ভাতা কীভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হবে, আর্থিক সুবিধা কোন পর্যায়ে কার্যকর হবে এবং নতুন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়নে কত সময় লাগবে—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা আসবে।

সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেল শুধু বেতন বৃদ্ধির বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও প্রভাব জড়িত। তাই মন্ত্রিসভা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কর্মীদের আর্থিক প্রত্যাশার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ের বিষয়টিও বিবেচনা করবে।

ফলে বহুদিনের অপেক্ষার পর নবম জাতীয় পে স্কেল এখন সিদ্ধান্তের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছালেও এর চূড়ান্ত রূপ জানতে মন্ত্রিসভার অনুমোদন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো কতটা এবং কীভাবে বাস্তবে কার্যকর হবে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর