ক্রিকেটে জীবন পাওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। কখনো সহজ ক্যাচ ফসকে যায়, কখনো ফিল্ডিংয়ের ভুলে ব্যাটসম্যান টিকে যান, আবার কখনো প্রযুক্তির সূক্ষ্ম সিদ্ধান্ত বদলে দেয় পুরো পরিস্থিতি। ডারউইন টেস্টের প্রথম দিনে অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান স্টিভেন স্মিথের সঙ্গে ঘটেছে এমনই এক নাটকীয় ঘটনা। একাধিকবার আউটের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত তিনি টিকে যান এবং দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৭১ রান করেন।
বাংলাদেশের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে স্মিথের শুরুটা মোটেও স্বস্তির ছিল না। মাত্র ২ রানে থাকতেই তানজিদ হাসানের হাতে ক্যাচ দিয়ে বেঁচে যান তিনি। এরপর আবারও তাঁর উইকেট পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু তৃতীয় স্লিপে কোনো ফিল্ডার না থাকায় সেই সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। শুরুতেই দুইবার জীবন পাওয়ার পর স্মিথ ধীরে ধীরে নিজের ইনিংস গুছিয়ে নেন।
তবে তাঁর সবচেয়ে আলোচিত রক্ষা পাওয়ার ঘটনা ঘটে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের ২১তম ওভারে। ইবাদত হোসেনের করা একটি বল স্মিথের ব্যাটের পাশ ঘেঁষে উইকেটকিপার লিটন দাসের গ্লাভসে জমা পড়ে। বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা জোরালো আবেদন করলেও মাঠের আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনা আউট দেননি।
বাংলাদেশ তখন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে রিভিউ নেয়। অন্যদিকে স্মিথের আচরণেই বোঝা যাচ্ছিল, তিনিও পরিস্থিতিকে নিজের বিপক্ষে বলে ধরে নিয়েছিলেন। তিনি এমনকি কিছুটা ড্রেসিংরুমের দিকেও হাঁটতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু প্রযুক্তিগত পরীক্ষায় আসে নাটকীয় মোড়।
আলট্রাএজে বল ও ব্যাটের সংস্পর্শের কোনো স্পষ্ট স্পাইক বা নির্ভরযোগ্য শব্দতরঙ্গ পাওয়া যায়নি। ফলে মাঠের আম্পায়ারের সিদ্ধান্তই বহাল থাকে। স্মিথকে আর মাঠ ছাড়তে হয়নি। দিনের খেলা শেষে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান অবশ্য স্বীকার করেন, তাঁর নিজেরও মনে হয়েছিল বলটি ব্যাটে স্পর্শ করেছিল। কিন্তু প্রযুক্তির ফল তাঁর পক্ষে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তিনি বেঁচে যান।
এই জীবন পাওয়ার মূল্য কতটা ছিল, তা বোঝা যায় অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের শেষ চিত্র দেখলেই। বাংলাদেশের দুর্দান্ত পেস আক্রমণের সামনে অস্ট্রেলিয়া মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে যায়। হাসান মাহমুদ একাই নেন ৬ উইকেট। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে স্মিথ ছাড়া উল্লেখযোগ্য বড় ইনিংস দেখা যায়নি। ফলে তাঁর ৭১ রান দলের স্কোরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হয়ে দাঁড়ায়।
স্মিথের ইনিংসটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে তাঁর শুরুতে পাওয়া একাধিক সুযোগের কারণে। তাঁর উইকেটের যেকোনো একটি সুযোগ বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারলে অস্ট্রেলিয়ার মোট সংগ্রহ আরও কমে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। বিশেষ করে রিভিউয়ের সেই মুহূর্তটি ম্যাচের প্রথম দিনের অন্যতম আলোচিত দৃশ্য হয়ে ওঠে।
তবে নিজের ভাগ্য নিয়ে বেশি কথা না বলে স্মিথ বাংলাদেশের বোলারদের প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, প্রথম দিন বাংলাদেশের সব বোলারই ভালো জায়গায় বল করেছেন। উইকেটে কিছুটা সিম মুভমেন্ট থাকায় ব্যাটসম্যানদের জন্য কাজটি কঠিন হয়ে উঠেছিল। ধারাবাহিকভাবে ভালো লেংথে বল করে বাংলাদেশের পেসাররা অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের স্বাভাবিক শট খেলার সুযোগও কমিয়ে দেন।
অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮ রানের জবাবে বাংলাদেশ প্রথম দিনের শেষভাগে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ২৪ ওভার ব্যাট করে এক উইকেট হারিয়ে স্বাগতিকরা সংগ্রহ করেছে ৯৬ রান। ফলে হাতে নয় উইকেট রেখে প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে মাত্র ১০২ রানে।
প্রথম দিনের হিসাব তাই স্পষ্টভাবেই বাংলাদেশের পক্ষে। একদিকে হাসান মাহমুদের ছয় উইকেট অস্ট্রেলিয়াকে ২০০ রানের নিচে আটকে দিয়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের ব্যাটাররা দিনের শেষভাগে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে রান তুলেছে। তবে স্মিথ মনে করছেন, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হাতছাড়া হয়নি। দ্বিতীয় দিনে অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা শুরুতেই কয়েকটি উইকেট তুলে নিতে পারলে বাংলাদেশের ওপর চাপ তৈরি করা সম্ভব।
ডারউইন টেস্টের প্রথম দিন তাই ক্রিকেটের অনিশ্চয়তার দুই ভিন্ন চিত্র দেখিয়েছে। বাংলাদেশের বোলিং ছিল আগ্রাসী ও কার্যকর, আর স্মিথ বারবার সুযোগ পেয়েও শেষ পর্যন্ত ক্রিজে টিকে ছিলেন। প্রযুক্তির একটি সিদ্ধান্ত তাঁকে বড় বিপদ থেকে বাঁচিয়েছে, আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে গুরুত্বপূর্ণ ৭১ রান যোগ করেছেন। এখন দ্বিতীয় দিনের শুরুতেই অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা কতটা দ্রুত বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে আঘাত হানতে পারেন, তার ওপর ম্যাচের পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে।









