জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ই আগস্ট ২০২৬, ১২:৩২ পিএম

১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগে মুজফ্ফরপুর জেলে ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় তরুণ বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর ৮ মাসের কাছাকাছি। এত অল্প বয়সে তাঁর আত্মত্যাগ তাঁকে ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য প্রতীকে পরিণত করেছে।
উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিশ শতকের শুরুর সময়টি ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল এক অধ্যায়। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে বাংলায় স্বদেশি আন্দোলন জোরদার হয়। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, বর্জন ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে তখন বহু তরুণ যুক্ত হতে শুরু করেন। ক্ষুদিরাম বসুও সেই সময়ের তরুণ বিপ্লবীদের অন্যতম হয়ে ওঠেন।
অতি অল্প বয়সেই তিনি ব্রিটিশবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। প্রচারপত্র বিলি, বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে নানা কর্মকাণ্ডে তাঁর অংশগ্রহণের কথা ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। কৈশোর পেরোনোর আগেই তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একজন পরিচিত তরুণ কর্মী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
১৯০৮ সালে মুজফ্ফরপুরে ব্রিটিশ বিচারক ডগলাস কিংসফোর্ডকে হত্যার উদ্দেশ্যে পরিচালিত অভিযানে ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী অংশ নেন। কিংসফোর্ড তখন বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে কঠোর রায় দেওয়ার জন্য পরিচিত ছিলেন। তাঁকে লক্ষ্য করে ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল রাতে একটি গাড়িতে বোমা নিক্ষেপ করা হয়। তবে লক্ষ্যভ্রষ্ট ওই হামলায় কিংসফোর্ড নিহত হননি। গাড়িতে থাকা দুই ইউরোপীয় নারী নিহত হন।
ঘটনার পর ক্ষুদিরাম মুজফ্ফরপুর থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে বৈনি রেলস্টেশনের কাছে তিনি গ্রেপ্তার হন। তাঁর কাছ থেকে অস্ত্র ও অন্যান্য সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছিল বলে মামলার নথিতে উল্লেখ পাওয়া যায়। অন্যদিকে প্রফুল্ল চাকী পুলিশের হাতে ধরা পড়ার আগে আত্মহত্যা করেন।
মুজফ্ফরপুর বোমা মামলায় ক্ষুদিরামের বিচার শুরু হয়। আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তাঁর বয়স এবং মামলার পরিস্থিতি নিয়ে সে সময় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ভোরে মুজফ্ফরপুর জেলে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
ফাঁসির আগে ক্ষুদিরামের আচরণ নিয়ে নানা ঐতিহাসিক বিবরণ রয়েছে। অল্প বয়সী এই বিপ্লবীর নির্ভীক উপস্থিতি সমকালীন মানুষের মধ্যে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলার তরুণদের মধ্যে ক্ষুদিরামকে ঘিরে ব্যাপক আবেগ ও শ্রদ্ধা তৈরি হয়। তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে গান, কবিতা, প্রচারপত্র ও লোকমুখে।
তাঁকে ঘিরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’ গানটি। পরবর্তী সময়ে এই গান ক্ষুদিরামের স্মৃতি ও আত্মত্যাগের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়। তাঁর ছবি ও নামও বিপ্লবী চেতনার প্রতীক হিসেবে তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
ক্ষুদিরামের জীবন ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিচার এবং মৃত্যুদণ্ড তাঁকে স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী পরিচিতি দিয়েছে। বিশেষ করে তরুণ বয়সে তাঁর আত্মত্যাগ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সাহস ও ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে।
তবে ক্ষুদিরামকে স্মরণ করার ক্ষেত্রে মুজফ্ফরপুরের ঘটনার বেদনাদায়ক দিকটিও ইতিহাসের অংশ। কিংসফোর্ডকে লক্ষ্য করে নিক্ষিপ্ত বোমায় নিরপরাধ দুই নারী নিহত হন। ফলে ঘটনাটি একই সঙ্গে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী কর্মকাণ্ড এবং সাধারণ মানুষের প্রাণহানির এক জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায় হয়ে আছে।
আজ ১১ আগস্ট, ক্ষুদিরাম বসুর মৃত্যুদিবস। তাঁর আত্মত্যাগ স্মরণ করার দিনটি শুধু একজন তরুণ বিপ্লবীর মৃত্যুকে স্মরণ করার দিন নয়; বরং উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক ইতিহাস, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং সেই সময়ের তরুণদের রাজনৈতিক ভূমিকা ফিরে দেখারও একটি উপলক্ষ।
মাত্র ১৮ বছরের এক তরুণ নিজের জীবন দিয়ে ইতিহাসে যে স্থান করে নিয়েছিলেন, তা সময়ের সঙ্গে মুছে যায়নি। তাঁর নাম আজও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধার সঙ্গে। অগ্নিযুগের সেই কিশোর বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু তাই ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে সাহস, আত্মত্যাগ ও তরুণ প্রত্যয়ের এক স্মরণীয় প্রতীক হয়ে আছেন।
মন্তব্য