জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ই আগস্ট ২০২৬, ১:৪৮ পিএম

বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুজাতার ৭৯তম জন্মদিন আজ। ১৯৪৭ সালের ১০ আগস্ট কুষ্টিয়ার একটি সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে জন্ম নেওয়া এই অভিনেত্রীর প্রকৃত নাম তন্দ্রা মজুমদার। পিতা গিরিজানাথ মজুমদার এবং মাতা বীণাপাণি মজুমদার। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নিজের জন্য একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন।
শৈশব থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ ছিল সুজাতার। অভিনয়জগতে তাঁর পথচলা শুরু হয় মঞ্চনাটকের মাধ্যমে। পরে ১৯৬৪ সালে ওবায়দুল হকের ‘দুই দিগন্ত’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে রূপালি পর্দায় অভিষেক ঘটে তাঁর। এরপর একের পর এক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি ধীরে ধীরে দর্শকের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
তবে তাঁর অভিনয়জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আসে ১৯৬৫ সালে ‘রূপবান’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। কাজী খালেক পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে রূপবান চরিত্রে অভিনয় করে রাতারাতি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন সুজাতা। সে সময় ‘রূপবান’ শুধু একটি সফল চলচ্চিত্রই ছিল না, বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকদের মধ্যে এটি ব্যাপক সাড়া তৈরি করেছিল। রূপবান চরিত্রের সঙ্গে সুজাতার নাম এমনভাবে জড়িয়ে যায় যে পরবর্তী সময়ে তিনি দর্শকের কাছে ‘রূপবানকন্যা’ হিসেবেই বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন।
‘রূপবান’-এর সাফল্যের পর সুজাতার অভিনয়জীবনে একের পর এক উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র যুক্ত হতে থাকে। ‘মেঘ ভাঙা রোদ’, ‘অর্পণ’, ‘অবুঝ মন’, ‘প্রতিনিধি’, ‘বেইমান’, ‘এতটুকু আশা’, ‘ধারাপাত’, ‘রহিম বাদশাহ ও রূপবান’, ‘রাজা সন্ন্যাসী’, ‘১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’, ‘ডাক বাবু’, ‘জরিনা সুন্দরী’, ‘অপরাজেয়’, ‘আয়না ও অবশিষ্ট’, ‘আগুন নিয়ে খেলা’, ‘কাঞ্চনমালা’, ‘আলিবাবা’, ‘মধুমালা’, ‘রাখাল বন্ধু’, ‘চেনা অচেনা’, ‘শহীদ তিতুমীর’, ‘মোমের আলো’, ‘গাজী কালু চম্পাবতী’, ‘পাতালপুরীর রাজকন্যা’, ‘অবাঞ্ছিত’, ‘বেদের মেয়ে’, ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’, ‘আলোর মিছিল’ ও ‘ছুটির ঘণ্টা’সহ বহু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।
১৯৬৭ সালে সে সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা আজিমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সুজাতা। অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিজীবনও দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের আলোচনায় রয়েছে।
১৯৭৮ সালের পর দীর্ঘ সময় অভিনয় থেকে দূরে ছিলেন তিনি। পরে আবার অভিনয়ে ফিরে আসেন। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মঞ্চনাটক ও টেলিভিশনেও কাজ করেছেন এই বর্ষীয়ান শিল্পী। ফলে তাঁর কর্মজীবনের বিস্তৃতি শুধু চলচ্চিত্রের পর্দাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।
বাংলা চলচ্চিত্রে দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতিও পেয়েছেন সুজাতা। তিনি একুশে পদক এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও পেয়েছেন একাধিক সম্মাননা। এর মধ্যে স্টার অ্যাক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডের আজীবন সম্মাননা এবং এটিএন বাংলা আজীবন সম্মাননাও রয়েছে।
সুজাতার সৃজনশীল কর্মকাণ্ড অভিনয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। লেখালেখির সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন এবং তাঁর লেখা একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
বাংলা চলচ্চিত্রের যে সময়কে স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেই সময়ের অন্যতম পরিচিত মুখ ছিলেন সুজাতা। তাঁর অভিনীত ‘রূপবান’ প্রজন্মের পর প্রজন্ম দর্শকের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। চলচ্চিত্রের চরিত্র, অভিনয়ের ধরন এবং দীর্ঘ কর্মজীবনের কারণে তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হয়ে আছেন।
আজ তাঁর ৭৯তম জন্মদিনে চলচ্চিত্রাঙ্গনের সহকর্মী, অনুরাগী ও দর্শকেরা স্মরণ করছেন তাঁর দীর্ঘ শিল্পীজীবন। কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও ‘রূপবানকন্যা’ সুজাতার নাম বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এখনও স্বতন্ত্র মর্যাদায় উচ্চারিত হয়।
বর্ষীয়ান এই অভিনেত্রীর জন্মদিনে রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। তাঁর সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করছেন চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শকেরা।
মন্তব্য