জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ই আগস্ট ২০২৬, ৪:৪২ পিএম

আর্থিক সক্ষমতা, বাণিজ্যিক সাফল্য এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সমন্বয়ে বিশ্ব ফুটবলে নতুন এক মাইলফলক গড়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। ২০২৫–২৬ মৌসুমে স্প্যানিশ ক্লাবটির বার্ষিক পরিচালন আয় দাঁড়িয়েছে ১.২২১ বিলিয়ন ইউরো, যা ক্রীড়া ইতিহাসে প্রথম কোনো ক্লাব বা ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১.২ বিলিয়ন ইউরোর বেশি পরিচালন আয় অর্জনের নজির। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই হিসাবের মধ্যে খেলোয়াড় বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
ফোর্বস-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগের মৌসুমের তুলনায় রিয়াল মাদ্রিদের আয় বেড়েছে ৩.১ শতাংশ। একই সময়ে ডেলয়েট ফুটবল মানি লিগ-এর সর্বশেষ তালিকাতেও ইউরোপের সর্বোচ্চ আয় করা ক্লাব হিসেবে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে রিয়াল। তালিকায় তাদের পরেই রয়েছে বার্সেলোনা, বায়ার্ন মিউনিখ, পিএসজি এবং লিভারপুল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সাফল্যের প্রধান ভিত্তি মাঠের ফলাফলের চেয়ে অনেক বেশি ক্লাবটির শক্তিশালী বাণিজ্যিক কাঠামো। আধুনিকায়ন করা সান্তিয়াগো বার্নাব্যু স্টেডিয়ামের বহুমুখী ব্যবহার, উন্নত বিপণন কৌশল, বৈশ্বিক ব্র্যান্ড মূল্য এবং নতুন স্পনসরশিপ চুক্তি রিয়ালের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎসে পরিণত হয়েছে।
২০১৮–১৯ মৌসুমে সান্তিয়াগো বার্নাব্যু স্টেডিয়ামের আধুনিকায়ন প্রকল্প শুরুর আগে ক্লাবটির বার্ষিক পরিচালন আয় ছিল ৭৫৭ মিলিয়ন ইউরো। কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই আয় বেড়ে ১.২২১ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে, যা প্রায় ৬১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সমান। অতিরিক্ত এই আয়ের প্রায় ৯৩ শতাংশই এসেছে ক্লাবের নিজস্ব বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে।
স্টেডিয়াম পুনর্নির্মাণ প্রকল্পের ইতিবাচক প্রভাবও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে আয়-ব্যয়ের হিসাবেই। বার্নাব্যু স্টেডিয়াম থেকে অর্জিত আয় ১০৭ শতাংশ বেড়ে ৩৬৩ মিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। একই সময়ে বিপণন ও স্পনসরশিপ খাত থেকে আয় বেড়ে হয়েছে ৫৩৯ মিলিয়ন ইউরো, যা আগের তুলনায় ৮২ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে টেলিভিশন সম্প্রচারস্বত্ব এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে প্রাপ্ত আয়ের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে সীমিত, যা ১১ শতাংশ।
চলতি মৌসুমেও প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। স্টেডিয়ামভিত্তিক আয় আরও ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, আর বিপণন খাতের আয় বেড়েছে ৬ শতাংশ। ক্লাবের ভাষ্য অনুযায়ী, আধুনিকায়ন করা বার্নাব্যুর বহুমুখী ব্যবহার, নতুন বাণিজ্যিক অংশীদার এবং দীর্ঘমেয়াদি স্পনসরশিপ চুক্তিগুলো এই ধারাবাহিক সাফল্যের প্রধান চালিকাশক্তি।
বার্নাব্যু পুনর্নির্মাণে এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১.৪০৮ বিলিয়ন ইউরো। প্রকল্পটি শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং ক্লাবের দাবি, সংস্কারের পর স্টেডিয়ামটি আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি আয় করছে। শুধু ফুটবল ম্যাচ নয়, বিভিন্ন বাণিজ্যিক আয়োজন ও বহুমুখী ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হওয়ায় স্টেডিয়ামটির আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
আর্থিক প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, খেলোয়াড়দের বেতন ও চুক্তি-সংক্রান্ত ব্যয়ও নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রাখা হয়েছে। স্কোয়াড পরিচালনায় ব্যয় হয়েছে ৬১৮ মিলিয়ন ইউরো, যা ক্লাবের মোট আয়ের ৪৬ শতাংশ। এটি রিয়াল মাদ্রিদের নির্ধারিত ৫০ শতাংশ ব্যয়সীমার নিচে রয়েছে, যা আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ইতিবাচক সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গত মৌসুমে নতুন খেলোয়াড় দলে ভেড়াতে ক্লাবটি ব্যয় করেছে ১৬১ মিলিয়ন ইউরো। পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আরও ১৯২ মিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করা হয়েছে। বর্তমানে রিয়াল মাদ্রিদের নিট সম্পদের পরিমাণ ৬২৪ মিলিয়ন ইউরো এবং হাতে রয়েছে ৮৩ মিলিয়ন ইউরো নগদ অর্থ। স্টেডিয়াম পুনর্নির্মাণ-সংক্রান্ত ঋণ বাদ দিলে ক্লাবটির নিট ঋণের পরিমাণ মাত্র ৯ মিলিয়ন ইউরো, যা বিশ্বের অন্যতম আর্থিকভাবে স্থিতিশীল ফুটবল ক্লাব হিসেবে তাদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।
রিয়াল মাদ্রিদের সর্বশেষ আর্থিক ফলাফল প্রমাণ করছে, আধুনিক অবকাঠামো, কার্যকর বাণিজ্যিক পরিকল্পনা এবং সুশৃঙ্খল আর্থিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয় একটি ফুটবল ক্লাবকে কেবল মাঠের সাফল্যেই নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও বৈশ্বিক মানদণ্ডে পৌঁছে দিতে পারে।
মন্তব্য