মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অনাকাঙ্ক্ষিত অগ্নিকাণ্ডের জের ধরে চরম গ্যাস সংকটে পড়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সময় পার করতে হচ্ছে পরিবহন চালকদের। ফলে অধিকাংশ চালকই হারাচ্ছেন দিনের মূল্যবান কর্মঘণ্টা, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে তাঁদের দৈনন্দিন আয় এবং জীবনযাত্রায়।
ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারি ও চালকদের ক্ষোভ
চট্টগ্রাম নগরের আকবরশাহ এলাকার পাহাড়িকা সিএনজি ফিলিং স্টেশন, ষোলশহরের ফসিলসহ প্রায় প্রতিটি পাম্পের সামনেই দেখা গেছে শত শত যানবাহনের দীর্ঘ সারি। ভোর চারটা-পাঁচটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও চার থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে অটোরিকশা, মাইক্রোবাস ও মিনিবাস চালকদের।
আকবরশাহ এলাকার অটোরিকশাচালক আবু তৈয়ব জানান, ভোর চারটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে বেলা দশটা পর্যন্ত গ্যাস পাননি তিনি। রাত কাটাতে হয়েছে গাড়িতেই। সারাদিনের বেশির ভাগ সময় যদি পাম্পের লাইনেই চলে যায়, তবে দিন শেষে গাড়ির মালিকের জমা দেওয়া এবং সংসারের খরচ তোলা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।
একই চিত্র দেখা গেছে চট্টগ্রাম-ফতেয়াবাদ রুটের মিনিবাস চালক মো. নাহিদের ক্ষেত্রেও। স্বাভাবিক সময়ে দিনে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা আয় হলেও, গ্যাস সংকটের কারণে তাঁর দৈনিক আয় কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬০০ টাকায়। অনেক চালক পরিবার চালাতে বাধ্য হয়ে ঋণ নিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন।
গ্যাস ঘাটতি ও কেজিডিসিএলের হিসাব
কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল)-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট। তবে বর্তমানে জাতীয় গ্রিড থেকে সংস্থাটি পাচ্ছে মাত্র ১৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১৬ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি নিয়েই সরবরাহ পরিচালনা করতে হচ্ছে।
সংকট মোকাবেলায় বাসাবাড়ি, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা এবং সিএনজি—সব খাতেই গ্যাসের সরবরাহ ও চাপ কমিয়ে আনা হয়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র: দৈনিক চাহিদা ১৫ কোটি ঘনফুট।
শিল্পকারখানা: দৈনিক চাহিদা ৯ কোটি ঘনফুট।
আবাসিক খাত: দৈনিক চাহিদা ৬ কোটি ঘনফুট।
সিএনজি খাত: দৈনিক চাহিদা ৫ কোটি ঘনফুট।
সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি থাকায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলো স্বাভাবিক মাত্রায় গ্যাস দিতে পারছে না, যার মূল প্রভাব পড়ছে চালক ও সাধারণ যাত্রীদের ওপর।
সংকটের মূল কারণ ও সমাধানের সম্ভাবনা
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে ‘একসিলারেট এনার্জি’ পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাই এই সংকটের মূল কারণ। ঘটনার পর থেকেই জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়।
কেজিডিসিএলের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পেট্রোবাংলার প্রাপ্ত বরাদ্দ অনুযায়ী সীমিত পরিসরে গ্যাস বিতরণ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালে বর্তমানে অভিজ্ঞ টেকনিক্যাল টিম মেরামতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যে মেরামত কাজ শেষ হলে পুনরায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক ধারায় ফিরবে বলে আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ততদিন পর্যন্ত রাস্তায় সিএনজিচালিত যানবাহনের ঘাটতি অব্যাহত থাকার পাশাপাশি যাত্রী ভোগান্তি ও ভাড়াবৃদ্ধির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।









