জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ই আগস্ট ২০২৬, ২:৩ পিএম

লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলায় পাওনা টাকা ফেরত না দেওয়া এবং বিবাদের জেরে ভাড়াটে খুনি দিয়ে সাবেক স্ত্রীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার অভিযোগে স্থানীয় এক জামায়াত কর্মীকে জেলা কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। অভিযুক্ত ব্যক্তি কমলনগর উপজেলার চর কালকিনি ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক রুকন আবু বক্কর সিদ্দিক। ২০২৩ সালের ১৫ জুন সংঘটিত বহুল আলোচিত এই হত্যা মামলায় দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর আদালতে আত্মসমর্পণ করতে গেলে বিচারক তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে এই নির্দেশ দেন।
Table of Contents
মামলা সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার পর থেকে প্রধান আসামি আবু বক্কর সিদ্দিক পলাতক ছিলেন। সম্প্রতি তিনি লক্ষ্মীপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনের আবেদন জানান।
আদালতের বাদীপক্ষের আইনজীবী আমজাদ হোসাইন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আসামি আবু বক্কর ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করে জামিন প্রার্থনা করেছিলেন। তবে শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনালের বিচারক সাদেকুর রহমান তাঁর অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনা করে জামিন আবেদন নাকচ করেন এবং তাঁকে সরাসরি কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা (বর্তমানে নেত্রকোনা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) মো. কামরুল হাসান এবং স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্যে এই হত্যাকাণ্ডের এক নৃশংস পটভূমি উন্মোচিত হয়েছে:
গোপন বিবাহ ও আর্থিক লেনদেন: আবু বক্কর সিদ্দিক কমলনগর উপজেলার পূর্ব চর মার্টিনের বালির পোল এলাকায় সালেহা বেগম নামের ওই নারীর বাড়িতে থাকতেন এবং তাঁর সন্তানদের পড়াশোনা করাতেন। সালেহার প্রথম স্বামী মারা যাওয়ার পর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের অজান্তে আবু বক্কর তাঁকে বিয়ে করেন। সে সময় আবু বক্করের প্রথম স্ত্রী ও পরিবার চর কালকিনি ইউনিয়নে বসবাস করছিল।
অর্থ আত্মসাৎ ও দূরত্ব তৈরি: বিয়ের পর জমি কেনার কথা বলে সালেহা বেগমের কাছ থেকে দফায় দফায় প্রায় ৩০ লাখ টাকা নেন আবু বক্কর। তবে তিনি কোনো জমি না কিনে উল্টো সালেহাকে তালাক দেন এবং সটকে পড়েন।
হত্যার পরিকল্পনা: সালেহা বেগম তাঁর পাওনা ৩০ লাখ টাকা ফেরতের জন্য চাপ সৃষ্টি করলে এবং আরও অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে আবু বক্কর তাঁকে নির্মমভাবে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন।
খুনির সঙ্গে চুক্তি: টাকা আত্মসাতের পথ চিরতরে বন্ধ করতে আবু বক্কর মো. সেলিম নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং মাত্র ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে সাবেক স্ত্রী সালেহাকে হত্যার চুক্তি করেন।
২০২৩ সালের ১৬ জুন কমলনগর উপজেলার মতিরহাট-সংলগ্ন মেঘনা নদীর তীরবর্তী এলাকা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে সালেহা বেগমের নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগের দিন অর্থাৎ ১৫ জুন তাঁকে হত্যা করা হয়। লাশ উদ্ধারের পর নিহত সালেহার মেয়ে ফাতেমা বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে কমলনগর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
তদন্তে নেমে পুলিশ ওই বছরের জুলাই মাসে ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত মো. সেলিমকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর সেলিম আদালতে দণ্ডবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাঁর জবানবন্দিতে বেরিয়ে আসে হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ বর্ণনা:
সেলিমের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, আবু বক্করের প্ররোচনা ও পরিকল্পনায় তিনি কৌশলে সালেহা বেগমকে মেঘনা নদীর তীরবর্তী নির্জন স্থানে ডেকে নিয়ে যান। সেখানে প্রথমে তাঁকে পাশবিক নির্যাতন ও ধর্ষণ করা হয় এবং পরবর্তীতে গলা টিপে হত্যা নিশ্চিত করা হয়। নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের পর সালেহার সঙ্গে থাকা মূল্যবান স্বর্ণালংকার নিয়ে সেলিম সাভারে পালিয়ে যান এবং তা বিক্রি করে দেন।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে সাবেক স্বামী আবু বক্কর সিদ্দিক এবং প্রত্যক্ষ বাস্তবায়নকারী হিসেবে মো. সেলিমকে অভিযুক্ত করা হয়।
এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি এ আর হাফিজ উল্যাহর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, আবু বক্কর পূর্বে দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর কোনো পদে বা দায়িত্বে নেই। একজন নারী ও সাবেক স্ত্রীর ওপর এমন জঘন্য ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে তাঁর নাম জড়িয়ে পড়ার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়ায় দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি পাওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মন্তব্য