খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ই আগস্ট ২০২৬, ৪:৩৭ পিএম

দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো প্রত্যাশিত মানে পৌঁছাতে পারেনি বলে উদ্বেগ জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তাঁর মতে, ব্যাংকিং খাতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী হয়নি। আর্থিক লেনদেন, গ্রাহকের তথ্য এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম ক্রমেই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে ওঠায় নিরাপত্তার ঘাটতি এখন পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্যই বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। গভর্নর বলেন, দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিষয়টি নিয়ে নিয়মিতভাবে উদ্বিগ্ন থাকতে হচ্ছে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে ব্যাংকিং সেবা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপ, এটিএম, কার্ডভিত্তিক লেনদেন এবং বিভিন্ন ডিজিটাল আর্থিক সেবার কারণে গ্রাহকরা ঘরে বসেই নানা ধরনের ব্যাংকিং সুবিধা নিতে পারছেন। এতে সময় ও খরচ কমেছে, লেনদেন হয়েছে দ্রুততর। কিন্তু ডিজিটাল নির্ভরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকির ধরনও বদলেছে।
ব্যাংকগুলোর তথ্যভান্ডারে এখন বিপুল পরিমাণ গ্রাহক-সংক্রান্ত ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য সংরক্ষিত থাকে। এসব তথ্যের অননুমোদিত প্রবেশ, চুরি বা অপব্যবহার হলে শুধু একজন গ্রাহক নয়, একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। একই সঙ্গে কোনো ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি অবকাঠামোতে হামলা হলে লেনদেন ব্যাহত হওয়া, সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতির মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। তাই সাইবার নিরাপত্তাকে এখন ব্যাংকের প্রযুক্তি বিভাগের সীমিত দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদও ভবিষ্যৎ সাইবার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, আগামী দিনে সাইবার হামলার প্রবণতা কমার সম্ভাবনা নেই; বরং প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে, আক্রমণের সুযোগও তত বিস্তৃত হবে। সাইবার অপরাধীরা নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরও জটিল ও বহুমাত্রিক হামলার কৌশল গ্রহণ করতে পারে। ফলে কেবল কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বা সরকারি সংস্থার একক উদ্যোগে এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
তিনি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এ অবস্থায় দেশের সামগ্রিক সাইবার প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়াতে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরি, নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং সম্ভাব্য হামলার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়নও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকগুলোর প্রযুক্তি ব্যবস্থা কোথায় দুর্বল, কোন ধরনের হামলার আশঙ্কা বেশি এবং কোনো আক্রমণ হলে কীভাবে দ্রুত সেবা পুনরুদ্ধার করা যাবে—এসব বিষয়ে নিয়মিত প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি কর্মীদের সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি, কারণ অনেক সাইবার হামলার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত দুর্বলতার পাশাপাশি মানবিক ভুল বা অসতর্কতাও ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
অনুষ্ঠানে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারের বিষয়টিও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাকস্বাধীনতার নামে বুলিং, মিথ্যা তথ্য ও হয়রানিমূলক কনটেন্টের প্রচারণা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই চলতে দেওয়া হবে না বলেও তিনি জানান।
সরকারকে ঘিরে মিথ্যা প্রচারণা ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিস্তার ঠেকাতেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে মেটা, গুগলসহ সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে শিগগির বৈঠক করার কথা অনুষ্ঠানে জানানো হয়।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, ব্যাংকিং খাতে নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়টি এখন আর শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িত গ্রাহকের আস্থা, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির নিরাপদ বিকাশ। ফলে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি দক্ষ সাইবার নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগ, নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, তথ্য সুরক্ষা নীতি হালনাগাদ এবং দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সাইবার ঝুঁকি সম্পর্কে তথ্য বিনিময় এবং সমন্বিত প্রস্তুতি থাকলে সম্ভাব্য হামলার ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। বিশেষ করে আর্থিক খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষেত্রে হামলা শনাক্ত, প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা বিবেচনায় সাইবার নিরাপত্তার এই উদ্বেগকে কেবল একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ডিজিটাল সেবার পরিধি যত বাড়বে, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর চাপও তত বাড়বে। তাই ভবিষ্যৎ সাইবার হামলার ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করা, আগাম প্রস্তুতি নেওয়া এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সংশ্লিষ্টদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
মন্তব্য