জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ই জুলাই ২০২৬, ৯:৫১ এএম

রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে সংগঠিত গণহত্যার অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক বস্ত্রমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ৩০ জুলাই বৃহস্পতিবার দুপুরে তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার পর বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে এ আদেশ প্রদান করা হয়।
Table of Contents
৩০ জুলাই বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার পর সাবেক এই প্রভাবশালী মন্ত্রীকে কড়া নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ট্রাইব্যুনালে হাজির করার পরপরই তাকে পরোয়ানামূলে এই মামলায় গ্রেফতার দেখানোর এবং কারাগারে পাঠানোর আনুষ্ঠানিক আবেদন জানায় প্রসিকিউশন পক্ষ।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই গ্রেফতার ও জামিন সংক্রান্ত বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউশনের পক্ষে অংশ নেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম এবং প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম আদালতকে অবহিত করেন যে, মতিঝিল শাপলা চত্বরের ঘটনার প্রেক্ষিতে দায়েরকৃত মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানার ভিত্তিতে আসামি আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যেহেতু আসামিপক্ষ থেকে ওই সময়ে কোনো জামিনের আবেদন কিংবা অন্যান্য কোনো আইনি আবেদন পেশ করা হয়নি, সেহেতু আসামিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে কারাগারে পাঠানোর জন্য ট্রাইব্যুনালের নিকট জোর দাবি জানান তারা। শুনানির সার্বিক বিষয়াটি বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউশনের আবেদন মঞ্জুর করেন এবং আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
শুনানি চলাকালে আসামিপক্ষের আইনজীবী আইনজীবী আবদুল্লাহ আল হারুন ভূঁইয়া লতিফ সিদ্দিকীর পক্ষে ওকালতনামায় স্বাক্ষরের জন্য আদালতের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করেন। একইসঙ্গে বিচারিক প্রক্রিয়া চলাকালীন বা তার পর ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় আসামির সঙ্গে পরামর্শ ও কথা বলার জন্য বিশেষ আবেদন পেশ করেন। বিচারক প্যানেল উভয় আবেদন পর্যালোচনা করে আইনজীবী ও আসামির মধ্যে হাজতখানায় আলোচনার বিষয়টি মঞ্জুর করেন।
পুরো শুনানি এবং বিচারিক প্রক্রিয়া চলার সময় সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী একাধিকবার আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করার আপ্রাণ চেষ্টা চালান। তবে ট্রাইব্যুনালের নিয়মিত নিয়ম ও বিচারিক নির্দেশনার কারণে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কথা বলার সুযোগ পাননি।
শুনানি সম্পন্ন হওয়ার পর বিচারকবৃন্দ যখন এজলাস ত্যাগ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনো লতিফ সিদ্দিকী কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আদালতের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। হাতে থাকা মাইক্রোফোন নিয়ে তিনি বারবার বলেন, “মাননীয় আদালত, আমি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। মহামান্য আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।”
পরপর চারবার উচ্চস্বরে এই আকুতি জানানোর পরও যখন বিচারিক কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়, তখন তিনি চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে উচ্চস্বরে বলে ওঠেন, “হায়রে হায়! এই যদি হয় আদালত, তাহলে আমি কোথায় যাব।”
বিচারকাজ শেষ হওয়ার পর দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা নিয়ম অনুযায়ী লতিফ সিদ্দিকীকে এজলাস কক্ষের কাঠগড়া থেকে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এগোতে থাকেন। পুলিশ সদস্যরা তাকে শান্ত হয়ে বসতে অনুরোধ করলে তিনি কিছুটা উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর চড়াও হন। উচ্চস্বরে পুলিশকে লক্ষ্য করে তিনি বলেন, “আমি বসে থাকব নাকি দাঁড়িয়ে থাকব সেটা আমার বিষয়। তোমরা বলার কে?”
হাজতখানার দিকে নিয়ে যাওয়ার সময়েও লতিফ সিদ্দিকী আবেগাপ্লুত ও ক্ষুব্ধ কণ্ঠে চিৎকার করে বলতে থাকেন, “আদালতকে বলতে চাইলাম ফাঁসি দিয়ে দেন। আমি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত আছি। কিন্তু আদালত তো শুনতেই চাইল না।” এসব কথা বলতে বলতেই পুলিশের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন তিনি এবং একপর্যায়ে পুলিশি পাহারায় তাকে এজলাস কক্ষ থেকে হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের মে মাসে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ওপর সরকারের পরিচালিত অভিযান ও গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ বিচারিক কার্যক্রম সচল হয়েছে, যার ধারাবাহিকতায় লতিফ সিদ্দিকীকে এই ট্রাইব্যুনালে আসামি হিসেবে এনে গ্রেফতার দেখানো হলো।
মন্তব্য