জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ই জুলাই ২০২৬, ১২:৫৭ পিএম

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা, সাহিত্য, নারীজাগরণ ও প্রগতিশীল সমাজচিন্তার ইতিহাসে বেবী মওদুদ এক উজ্জ্বল ও অবিস্মরণীয় নাম। তিনি ছিলেন একাধারে প্রখ্যাত প্রবীণ সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক, সম্পাদক এবং সাবেক সংসদ সদস্য। সত্য প্রকাশে আপসহীন মনোভাব, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ এই ব্যক্তিত্ব আজীবন অন্যায় ও অসাম্যের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন।
Table of Contents
বেবী মওদুদের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৩ জুন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায়। তাঁর প্রকৃত নাম এ. এন. মাহফুজা খাতুন, তবে সর্বমহলে তিনি ‘বেবী মওদুদ’ নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন। তাঁর পিতা বিচারপতি আবদুল মওদুদ এবং মাতা হেদায়েতুন নেসা ছিলেন অত্যন্ত শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা। ছয় ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি মারজি-উল হক তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা।
পারিবারিক আবহই তাঁকে খুব ছোটবেলা থেকে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ছাত্রজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সম্মানসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই তিনি প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন। গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা তাঁর জীবনের মূল আদর্শ হয়ে ওঠে।
শিক্ষা জীবন শেষ করে বেবী মওদুদ পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকে বেছে নেন, যা তখনকার সময়ে নারীদের জন্য ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি সাংবাদিকতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে মেধা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) এবং জনপ্রিয় ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় নানা সংবাদমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। বিচিত্রায় ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘বিবিসি বাংলা’ এবং বাংলাদেশ বেতারেও তিনি কাজ করেছেন।
সাংবাদিক হিসেবে তিনি কেবল খবরের পেছনের খবরই তুলে আনেননি, বরং নারীদের অধিকার, সামাজিক বৈষম্য, সমাজবাস্তবতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সপক্ষে নিরলস লিখে গেছেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যে, বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের উপযোগী সাহিত্যে তাঁর অবদান অনন্য। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি মননশীল ও আলোকিত জাতি গঠনে শিশুদের সঠিকভাবে গড়ে তোলা জরুরি। তাঁর রচিত অসংখ্য গল্প, প্রবন্ধ, নিবন্ধ এবং জীবনীমূলক গ্রন্থ শিশু-কিশোরদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাঁর সহজ-সরল ভাষা এবং শিক্ষণীয় বক্তব্য বহু প্রজন্মের মনন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বেবী মওদুদ রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে অত্যন্ত সচেতন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী ও ঘনিষ্ঠ সুহৃদ ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ৯ম জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন (ঠাকুরগাঁও-১ ভিত্তিক) থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন এবং জাতীয় পর্যায়ে নীতি নির্ধারণী ভূমিকা পালন করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ়চেতা ও আত্মপ্রত্যয়ী এক নারী। তাঁর স্বামী অ্যাডভোকেট মো. হাসান আলীর অকালমৃত্যুর পর তিনি জীবনের সকল প্রতিকূলতা ও বাধা-বিপত্তি জয় করে একাই দুই সন্তানকে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন। কোনো পারিবারিক কিংবা সামাজিক প্রতিকূলতাই তাঁর কর্মস্পৃহা ও আদর্শিক অবস্থান থেকে তাঁকে টলাতে পারেনি।
২০১৪ সালের ২৫ জুলাই এই দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্ব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর শারীরিক প্রয়াণ ঘটলেও, তাঁর রেখে যাওয়া সাহিত্যকর্ম, সাংবাদিকতার সাহসী ভূমিকা এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের প্রত্যয় চিরকাল অমলিন থাকবে। বেবী মওদুদের সত্যনিষ্ঠ জীবন ও সাহসী কলম আজও বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সাহিত্যাঙ্গনে অনুপ্রেরণার অনির্বাণ শিখা হয়ে জ্বলছে।
মন্তব্য