জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ই জুলাই ২০২৬, ১:১৮ পিএম

মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলায় প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল এবং স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের বিচারহীনতার দরুন নাছিমা বেগম (২৮) নামের এক গৃহবধূর আত্মহত্যার চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন, ধারণকৃত গোপনীয় ভিডিও প্রকাশ করার ভয় দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ এবং সর্বশেষে গ্রাম্য সালিশে ন্যায়বিচার না পাওয়ার মানসিক যন্ত্রণা সইতে না পেরে তিনি এই চরম পথ বেছে নেন। ঘটনাটি ঘটেছে দৌলতপুর উপজেলার কলিয়া ইউনিয়নের অন্তর্গত তালুকনগর গ্রামে। নিহত নাছিমা বেগম ওই গ্রামেরই এক মালয়েশিয়া/বিদেশ প্রবাসী যুবকের স্ত্রী ছিলেন।
নিহতের পারিবারিক সূত্র ও মামলার এজাহার অনুযায়ী, স্বামী প্রবাসে থাকার সুযোগে প্রতিবেশী শাকিল নামে এক যুবক নাছিমার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। শাকিল স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ইনসান পীর সাহেবের ছেলে। সম্পর্কের একপর্যায়ে শাকিল তাঁকে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং সুকৌশলে তার কিছু আপত্তিকর ভিডিও ফুটেজ মোবাইল ফোনে ধারণ করে রাখেন।
পরবর্তী সময়ে সেই সংবেদনশীল ভিডিও ফুটেজ দেখিয়ে সামাজিকভাবে ব্ল্যাকমেইল করা শুরু করেন শাকিল। ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে তিনি নাছিমার কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রায় দুই লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি একপর্যায়ে নাছিমা যখন বিয়ের জন্য জোড় তাগিদ দেন, তখন শাকিল বিয়ে করতে অস্বীকার করেন এবং নাছিমাকে নানাভাবে অপমান-অপদেস্থ করতে থাকেন।
সমস্যার সমাধানে এবং সামাজিকভাবে মর্যাদা ফিরে পাওয়ার আশায় বিষয়টি নিয়ে গ্রাম্য সালিশের শরণাপন্ন হন নিহতের পরিবার। গত ১৮ জুলাই তালুকনগর গ্রামের বাসিন্দা ডক্টর আলমগীরের বাড়িতে এক সালিশি সভা আহ্বান করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, উক্ত সালিশে নিরপেক্ষতা বজায় না রেখে পীরের ছেলের সামাজিক ও আর্থিক ক্ষমতার দাপটে একপক্ষীয়ভাবে অভিযুক্তের পক্ষে রায় দেওয়া হয় এবং নিহতের পরিবারকে উল্টো হেয় প্রতিপন্ন করা হয়।
নিহতের স্বজনদের দাবি, সুবিচারের শেষ ভরসাস্থল সালিশি বৈঠকেও অবিচারের শিকার হয়ে চরম মানসিক হতাশা ও ক্ষোভে নিমজ্জিত হন নাছিমা। সালিশ বৈঠকে উপস্থিত ব্যক্তি ও মাতব্বরদের তালিকা নিচে তুলে ধরা হলো:
| তালুকনগর গ্রামের সালিশ বৈঠকে উপস্থিত মাতব্বর ও ব্যক্তিবর্গ |
| ১. ডক্টর আলমগীর (সালিশের স্থান ও আহ্বায়ক) |
| ২. শরিফ ইসলাম লালন (স্থানীয় ইউপি সদস্য) |
| ৩. আলেক |
| ৪. হাবেল |
| ৫. জলিল |
| ৬. শামসুল |
| ৭. রবিজ্জল |
| ৮. সুরমান |
| ৯. আলিম |
| ১০. আনোয়ার |
| ১১. আলম |
| ১২. সিরাজুল |
সালিশ থেকে চরম অপমান ও হতাশা নিয়ে ফেরার পরদিন সকালেই নিজ বাড়ির রান্নাঘরের পাশে শাড়ির আঁচল পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন নাছিমা। খবর পেয়ে দৌলতপুর থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে এবং সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত শেষে মানিকগঞ্জ জেলা হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য প্রেরণ করে।
এ ঘটনায় গভীর শোক ও বিচারের দাবি জানিয়ে নিহতের বাবা মো. আব্দুল হক বাদী হয়ে দৌলতপুর থানায় প্ররোচনা ও প্রতারণার অভিযোগ এনে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। নিহতের ভাই রাসেল মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার বোনটি গ্রাম্য বিচারে বিচার পাওয়ার আশায় গিয়ে চরম অপমানিত হয়ে ফিরেছিল। প্রভাবশালী চক্রটি অপরাধীকে বাঁচানোর চেষ্টা করায় আমার বোন আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে।”
দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) স্বপন কুমার সরকার এ বিষয়ে জানান, মামলা গ্রহণের পরপরই পুলিশের একটি বিশেষ টিম অভিযান চালিয়ে এজাহারভুক্ত এক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। বাকি অভিযুক্তদের দমনে ও ঘটনার পেছনে থাকা অপরাধমূলক ভিডিও প্রমাণের রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত জোরদার করা হয়েছে।
মন্তব্য