খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ই জুলাই ২০২৬, ৮:৪৬ পিএম

রাজধানীর সবুজবাগে ইব্রাহিম পলাশ নামে এক যুবককে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, হত্যার পর তার দুই হাতের কবজি কেটে নিয়ে যায় হামলাকারীরা। তবে মরদেহ উদ্ধার হলেও বিচ্ছিন্ন দুই হাত এখনো খুঁজে পায়নি পুলিশ।
মঙ্গলবার (২০ জুলাই) সবুজবাগের রাজারবাগ বাজার এলাকায় পানির পাম্পসংলগ্ন একটি মুদি দোকানের সামনে হামলার শিকার হন পলাশ। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলে সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ময়নাতদন্তের জন্য তার মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
নিহতের পরিবারের দাবি, পলাশ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে স্ত্রী খুব বেশি জানতেন না বলে জানিয়েছেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, মাত্র পাঁচ মাস আগে বিয়ে করেছিলেন পলাশ। নতুন সংসার গুছিয়ে নেওয়ার সময়ই তাকে প্রাণ দিতে হলো।
পলাশের বড় বোন জোসনা বেগম জানান, ঘটনার দিন বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে তার মেয়ের জন্য খাবার নিয়ে বাসা থেকে বের হন পলাশ। খাবার পৌঁছে দেওয়ার পর তিনি কালিবাড়ি এলাকায় একটি কাজে যাওয়ার কথা জানান। এরপর পরিবারের সদস্যরা খবর পান, পলাশকে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে রাস্তায় ফেলে গেছে।
মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি। জোসনা বেগমের অভিযোগ, হামলাকারীরা তার ভাইকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করেছে এবং তার দুই হাতের কবজি কেটে নিয়ে গেছে।
পলাশের স্ত্রী মরিয়ম জানান, তাদের পরিচয়ের পর অল্প সময়ের মধ্যেই বিয়ে হয়। পাঁচ মাসের সংসার জীবনে তারা ভালোই ছিলেন। তিনি সম্প্রতি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন এবং চলতি মাসে ফল প্রকাশের অপেক্ষায় ছিলেন। স্বামীকে হারিয়ে তিনি এখন দিশেহারা।
মরিয়মের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন দুপুরে পলাশ বাসায় ছিলেন। পরে তিনি বাইরে বেরিয়ে যান। সন্ধ্যার পর পলাশ একবার ফোন করলেও তিনি তা ধরতে পারেননি। পরে স্বামীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করে বার্তা পাঠান। পলাশ বার্তাটি দেখলেও কোনো উত্তর দেননি। রাত আটটা থেকে সোয়া আটটার মধ্যে এক ব্যক্তি তাদের বাড়িতে এসে জানান, পলাশকে কারা যেন কুপিয়ে রাস্তায় ফেলে গেছে। এরপর পরিবারের সদস্যরা প্রথমে মুগদা হাসপাতালে যান এবং পরে জানতে পারেন, পলাশকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়েছে। সেখানে গিয়ে তারা তার মৃত্যুর খবর পান।
স্বামীর সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল কি না, সে বিষয়ে মরিয়ম বলেন, পলাশ কার সঙ্গে রাজনীতি করতেন বা বাইরে কী করতেন, তা তিনি বিস্তারিত জানতেন না। তবে কয়েক দিন আগে মোবাইল ফোনকে কেন্দ্র করে কিছু ব্যক্তির সঙ্গে তার বিরোধ হয়েছিল বলে তিনি শুনেছিলেন। পরে সেই বিরোধ মিটে যায় বলেও জানতেন তিনি।
পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে পলাশের মাথা, ঘাড়, বুক ও কোমরসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দুই হাতই কবজি থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং ধারালো অস্ত্রের আঘাতেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। একটি ফুটেজে দেখা যায়, রাত আনুমানিক ৮টা ১০ মিনিটে এক ব্যক্তি হাতে ধারালো অস্ত্র নিয়ে এসে প্রকাশ্যে আরেক ব্যক্তির ওপর হামলা করছেন। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, হামলাকারী হিসেবে রয়েল নামে এক ব্যক্তিকে শনাক্ত করা গেছে। তবে ফুটেজ বিশ্লেষণ ও অন্যান্য তদন্তের মাধ্যমে তার পরিচয় ও ভূমিকা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
এর আগে গত ১৫ জুলাই একটি রিকশার গ্যারেজে কয়েকজন যুবকের হামলার দৃশ্যও সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে বলে জানা গেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, গ্যারেজের একজন ম্যানেজারের ওপর চাঁদা চাওয়াকে কেন্দ্র করে ওই হামলার ঘটনা ঘটে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা এসব ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন।
সবুজবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক তদন্তে পলাশের সঙ্গে রয়েল নামে এক ব্যক্তির আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে। ওই বিরোধের একপর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে এবং রয়েলের পরিবারের একজন সদস্যও এতে আহত হন বলে পুলিশ জানতে পেরেছে। এরপর থেকেই বিরোধ আরও তীব্র হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওসি বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে হত্যাকাণ্ডের সময় চারজনকে দেখা গেছে। তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি হত্যার পর কেটে নেওয়া পলাশের দুই হাতের কবজিও উদ্ধার করা যায়নি।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় একাধিক সূত্র হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আরও কিছু ঘটনার কথা বলেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি রিকশা চুরি ও স্থানীয় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে কয়েকজনের সঙ্গে পলাশের বিরোধ তৈরি হয়েছিল। রিকশার মালিকেরা চুরি যাওয়া রিকশা উদ্ধারের বিষয়ে পলাশের কাছে অভিযোগ করেছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের আরও দাবি, ওই বিরোধের জেরে কয়েক দিন আগে রয়েল নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে পলাশের কথা কাটাকাটি ও হামলার ঘটনা ঘটে। পরে ঘটনার দিন স্থানীয়ভাবে আরেকটি চুরির ঘটনা মীমাংসা করতে পলাশের ভূমিকা নেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে তার ওপর হামলা চালানো হয় বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এসব তথ্যের কিছু অংশ এখনো পুলিশের তদন্তে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। ফলে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং হামলায় কারা সরাসরি জড়িত ছিলেন, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না।
গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে আরও দাবি করা হয়েছে, স্থানীয় কয়েকজন অপরাধীকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এমন এক ব্যক্তির বাসায় হত্যার আগে পলাশকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পুলিশ এসব অভিযোগও যাচাই করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে, হত্যাকাণ্ডের পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পলাশের স্বজনেরা দ্রুত জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং বিচারের দাবি জানিয়েছেন। পুলিশ বলছে, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে নিখোঁজ দুই হাত উদ্ধারের বিষয়েও অভিযান চালানো হচ্ছে।
মন্তব্য