খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ই জুলাই ২০২৬, ২:৪৯ পিএম

বাংলার লোকসংগীতের সুদীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাসে যে কজন কালজয়ী সাধক নিজেদের সৃষ্টিশীলতা দিয়ে লোকজ সংস্কৃতিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয় কানাইলাল শীলের নাম। যিনি তাঁর আঙুলের জাদুকরী স্পর্শে দোতারার তারে তারে তুলেছিলেন গ্রামবাংলার মাটি ও মানুষের হৃদস্পন্দন। আজ ২০ জুলাই, লোকসংগীতের এই প্রবাদপ্রতিম পুরুষ, সুরকার, সংগ্রাহক ও “দোতারার যাদুকর” কানাইলাল শীলের মহাপ্রয়াণ দিবস। ১৯৭৪ সালের এই দিনে ঢাকায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণ দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি এই মহান শিল্পীকে, যাঁর সুরের মূর্ছনা আজও বাঙালির সাংস্কৃতিক সত্তায় চিরভাস্বর।
Table of Contents
১৮৯৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলার কইরাল গ্রামে এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কানাইলাল শীল। তাঁর পিতা আনন্দচন্দ্র শীল এবং মাতা সৌদামিনী শীল। শৈশবের শুরুতেই, মাত্র আড়াই বছর বয়সে তিনি পিতৃহারা হন। চরম দারিদ্র্য ও জীবনসংগ্রামের মুখোমুখি হয়েও তাঁর ভেতরের সহজাত শিল্পীসত্তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়নি, বরং প্রতিকূলতার মাঝেই তিনি সুরের আলো খুঁজে নিয়েছিলেন।
মাত্র আট বছর বয়সে ওস্তাদ বসন্ত কুমার শীলের কাছে বেহালা শিখার মাধ্যমে তাঁর সংগীত জীবনের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। সুরের প্রতি অদম্য টান থেকে ১১ বছর বয়সে ওস্তাদ মতিলালের কাছে তিনি বেহালা শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ তালিম সম্পন্ন করেন। তবে পরবর্তীতে বেহালার গণ্ডি পেরিয়ে দোতারাই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রধান ধ্যান-জ্ঞান ও আত্মপ্রকাশের মূল মাধ্যম।
কানাইলাল শীলের সাঙ্গীতিক জীবনে সবচেয়ে বড় মোড় আসে ফরিদপুরের অম্বিকাপুরে একটি যাত্রাপালার আসরে। সেখানে তাঁর অসাধারণ পরিবেশনা দেখে মুগ্ধ হন পল্লীকবি জসীমউদ্দীন। পল্লীকবি জসীমউদ্দীন এই অনন্য প্রতিভাকে চিনে নিতে ভুল করেননি। তিনিই কানাইলাল শীলকে তৎকালীন সাংস্কৃতিক রাজধানী কলকাতায় নিয়ে যান। কলকাতায় তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় লোকসংগীতের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের। আব্বাসউদ্দীন আহমদের উৎসাহ, গভীর সখ্যতা ও সহযোগিতায় কানাইলাল শীল লোকগান রচনা, সুরারোপ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংগীত পরিমণ্ডলে যুক্ত হন। তৎকালীন বিখ্যাত গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি অসংখ্য কালজয়ী গানের নেপথ্য কারিগর হিসেবে কাজ শুরু করেন।
কলকাতার সাংস্কৃতিক আবহে কানাইলাল শীল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সান্নিধ্য লাভ করেন। নজরুলের অসংখ্য জনপ্রিয় গানে দোতারার সুরের মায়াজাল বুনেছিলেন তিনি, যা নজরুলের লোকজ ঘরানার গানগুলোকে দিয়েছিল এক ভিন্ন মাত্রা। পরবর্তীতে তিনি ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’ (কলকাতা কেন্দ্র)-এর নিয়মিত স্টাফ আর্টিস্ট এবং দোতারাবাদক হিসেবে যোগদান করেন। রেডিওর মাধ্যমে তাঁর দোতারার সুর গ্রামবাংলার গণ্ডি পেরিয়ে শহুরে নাগরিক ও অভিজাত শ্রোতাদের হৃদয়েও গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে।
কানাইলাল শীল কেবল একজন বাদ্যশিল্পী বা সুরকারই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন একনিষ্ঠ লোকসংগীত গবেষক ও সংগ্রাহক। বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে তিনি হারিয়ে যেতে বসা অসংখ্য লোকগান ও লোকসুর সংগ্রহ করেন। গ্রামীণ ঐতিহ্যের সেই অমূল্য সুরগুলোকে পরম মমতায় তিনি সংরক্ষণ করেছিলেন, যা না হলে হয়তো আজ বহু আদিম লোকসুর কালের গহ্বরে হারিয়ে যেত। নতুন প্রজন্মের কাছে লোকসংগীতের এই ঐশ্বর্য পৌঁছে দিতে তিনি আমৃত্যু কাজ করে গেছেন।
কানাইলাল শীলের বর্ণাঢ্য জীবন, সাধনা ও প্রাপ্তির একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা নিচে তুলে ধরা হলো:
| বিষয়/ঘটনা | বিবরণ |
| নাম | কানাইলাল শীল |
| উপাধি | দোতারার যাদুকর |
| জন্ম তারিখ | ৫ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দ |
| জন্মস্থান | কইরাল গ্রাম, নগরকান্দা, ফরিদপুর |
| পিতা ও মাতা | আনন্দচন্দ্র শীল ও সৌদামিনী শীল |
| বেহালায় হাতেখড়ি | ওস্তাদ বসন্ত কুমার শীল (৮ বছর বয়সে) |
| বেহালার পূর্ণাঙ্গ তালিম | ওস্তাদ মতিলাল (১১ বছর বয়সে) |
| জীবন পরিবর্তনকারী সাক্ষাৎ | পল্লীকবি জসীমউদ্দীন (ফরিদপুরের অম্বিকাপুরে) |
| কলকাতায় প্রধান সহযোগী | লোকসম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদ |
| কর্মক্ষেত্র | তৎকালীন গ্রামোফোন কোম্পানি ও অল ইন্ডিয়া রেডিও (কলকাতা কেন্দ্র) |
| অনন্য সংযোগ | জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বহু গানে দোতারাবাদন |
| জাতীয় স্বীকৃতি | একুশে পদক (১৯৮৭ সালে, মরণোত্তর) |
| মহাপ্রয়াণ | ২০ জুলাই, ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দ (ঢাকা) |
বাঙালি সংস্কৃতিতে কানাইলাল শীলের অবদান অবিস্মরণীয়। লোকসংগীতকে বিশ্বদরবারে এবং আধুনিক নাগরিক সমাজে পরিচিত করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা পথপ্রদর্শকের। শিল্পীর শারীরিক মৃত্যু ঘটলেও দোতারার প্রতিটি তারের ঝংকারে, মাটির সুরে কানাইলাল শীল আজও বেঁচে আছেন এবং থাকবেন। বাংলাদেশ সরকার তাঁর এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৭ সালে তাঁকে মরণোত্তর দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে।
আজকের এই দিনে এই মহান সুরসাধকের প্রতি রইল আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাঁর জীবন ও সুরের সাধনা আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য লোকসংস্কৃতি রক্ষায় চিরকাল প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
মন্তব্য