জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ই জুলাই ২০২৬, ২:৩০ পিএম

বাংলা সংগীতের আকাশে এক ধ্রুবতারার নাম মিতালী মুখার্জী। ১৯ জুলাই ময়মনসিংহের এক অভিজাত ও জ্ঞানদীপ্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করা এই শিল্পী তাঁর কণ্ঠে ধারণ করেছেন শাস্ত্রীয় সংগীতের শুদ্ধতা এবং আধুনিক গানের কোমলতা। পিতা অমূল্য কুমার মুখার্জী এবং মাতা কল্যাণী মুখার্জীর সুশৃঙ্খল ও সংস্কৃতিমনস্ক পরিবেশে বেড়ে ওঠায় সংগীতের প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল জন্মগত। সেই শৈশবের শখই পরবর্তীতে পেশাদার সংগীত সাধনায় রূপ নেয়।
মিতালী মুখার্জীর সংগীতের ভিত গড়া হয়েছিল ওস্তাদ পিটার মিঠুন দে-র সান্নিধ্যে। পরবর্তীতে উচ্চাঙ্গ সংগীতে নিজেকে আরও নিপুণ করে তুলতে তিনি পাড়ি জমান ভারতের বরোদায়। সেখানকার মহারাজা সায়াজিরাও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংগীতের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে তিনি নিজেকে একজন পরিপূর্ণ শিল্পী হিসেবে গড়ে তোলেন।
মিতালী মুখার্জীর কণ্ঠ কেবল বাংলা গানের সীমাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি হিন্দি, গুজরাটি, পাঞ্জাবি ও তামিলসহ বিভিন্ন ভাষায় নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তবে তাঁর শিল্পীজীবনের পরম প্রাপ্তি ধরা দেয় ১৯৮২ সালে। কিংবদন্তি নির্মাতা আমজাদ হোসেনের ‘দুই পয়সার আলতা’ সিনেমার কালজয়ী গান “এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নাই” গেয়ে তিনি জয় করে নেন অগণিত শ্রোতার হৃদয়। এই গানে তাঁর আবেগ ও গায়কী তাঁকে এনে দেয় শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে বাংলাদেশের ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’।
পরবর্তী সময়ে সংগীতের মঞ্চে তাঁর পদচারণা ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল। দেশ-বিদেশের অসংখ্য কনসার্টে তিনি শাস্ত্রীয় সংগীত এবং গজলের যে ঐশ্বর্য উপস্থাপন করেছেন, তা সংগীতপ্রেমীদের মনে গভীর রেখাপাত করেছে। ২০১৫ সালে সিটি ব্যাংক তাঁকে “গানে গানে গুণীজন সংবর্ধনা”র মাধ্যমে বিশেষভাবে সম্মানিত করে, যা তাঁর দীর্ঘ সংগীতজীবনের নিরলস সাধনার এক স্বীকৃতি।
মিতালী মুখার্জীর জীবনের অনেকটা সময় জুড়ে ছিল গজলসম্রাট ভূপেন্দ্র সিংহের সান্নিধ্য। ১৯৮২ সাল থেকে এই যুগল মুম্বইয়ে বসবাস শুরু করেন। তাঁদের দীর্ঘ দাম্পত্য জীবন কেবল ব্যক্তিগত ছিল না, ছিল সুরের এক নিবিড় সহযাত্রিতা। কিন্তু নিয়তির পরিহাসে ২০২২ সালের ১৮ জুলাই—নিজের জন্মদিনের ঠিক আগের দিন—ভূপেন্দ্র সিংহ পরলোকগমন করেন। সেই শোকের ছায়া অতিক্রম করে আজও মিতালী মুখার্জী নিজের সংগীতের মাধুর্য ধরে রেখেছেন।
দীর্ঘ ২৮ বছর পর বাংলাদেশের মাটিতে তাঁর প্রত্যাবর্তন ছিল এক আবেগঘন ঘটনা। শিকড়ের টানে ফিরে আসা এই শিল্পী তাঁর দেশের মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছিলেন। তিনি কেবল একজন গায়িকা নন, বরং দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত সেতুবন্ধন।
নিচে মিতালী মুখার্জীর জীবন ও কর্মের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | বিষয় | তথ্যের বিবরণ |
| ০১ | নাম | মিতালী মুখার্জী |
| ০২ | জন্ম তারিখ | ১৯ জুলাই |
| ০৩ | জন্মস্থান | ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ |
| ০৪ | পিতার নাম | অমূল্য কুমার মুখার্জী (ডিআইজি) |
| ০৫ | মায়ের নাম | কল্যাণী মুখার্জী |
| ০৬ | সংগীতের গুরু | ওস্তাদ পিটার মিঠুন দে |
| ০৭ | শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান | মহারাজা সায়াজিরাও বিশ্ববিদ্যালয়, বরোদা |
| ০৮ | শ্রেষ্ঠ পুরস্কার | জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৮২) |
| ০৯ | কালজয়ী গান | এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নাই |
| ১০ | জীবনসঙ্গী | ভূপেন্দ্র সিংহ (প্রখ্যাত গজলশিল্পী) |
| ১১ | স্থায়ী আবাসন | মুম্বই, ভারত (১৯৮২ সাল থেকে) |
| ১২ | সংবর্ধনা | সিটি ব্যাংক গুণীজন সংবর্ধনা (২০১৫) |
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা স্মরণ করি সেই সব সুর, যা মিতালী মুখার্জী আমাদের উপহার দিয়েছেন। তাঁর সংগীত সাধনা আগামী প্রজন্মের শিল্পী ও শ্রোতাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। সুরসম্রাজ্ঞীর জন্মদিনে তাঁকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। প্রার্থনা করি, তিনি আরও দীর্ঘকাল আমাদের মাঝে তাঁর সুরের মাধুর্য বিলিয়ে দিয়ে সুস্থ ও সুন্দর জীবন অতিবাহিত করুন।
শুভ জন্মদিন, মিতালী মুখার্জী! আপনার কণ্ঠের যাদু চিরকাল অটুট থাকুক।
মন্তব্য