খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুন ২০২৬, ১১:১৫ পিএম

ডিজিটাল মাধ্যমের অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক জুয়ার ভয়াবহ থাবা রুখতে জাতীয় সংসদে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন-২০২৬’ পাস হয়েছে। নতুন এই আইনে অপরাধীদের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা জরিমানার কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। দেড় শতাব্দীরও বেশি পুরোনো অর্থাৎ ১৫৯ বছরের প্রাচীন একটি অকার্যকর আইন বাতিল করে বর্তমান সময়ের উপযোগী করে নতুন এই আইনটি প্রণয়ন করা হলো।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া সংসদ অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করেন। পরে উপস্থিত সংসদ সদস্যদের সর্বসম্মতিতে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। একই দিনে সংসদে ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) বিল-২০২৬’ নামের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হয়েছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এই সংশোধনী বিলটি পাসের প্রস্তাব করলে তাও সর্বসম্মতিতে অনুমোদন পায়।
পাস হওয়া জুয়া প্রতিরোধ বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্বলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এত দিন দেশে কার্যকর থাকা ‘দ্য পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট-১৮৬৭’ দেড়শতাধিক বছরেরও বেশি পুরোনো। বর্তমান ডিজিটাল যুগে অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক আধুনিক জুয়া প্রতিরোধে এই প্রাচীন আইনি কাঠামো একেবারেই অকার্যকর ও অপর্যাপ্ত হয়ে পড়েছিল।
বর্তমান সময়ে বিভিন্ন অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্ম, ভিপিএন (VPN), সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ভুয়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) অ্যাকাউন্ট এবং নানা ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার অপব্যবহার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সংঘটিত জুয়া, অর্থপাচার ও প্রতারণা দেশের সামাজিক শৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে। একই সাথে এটি তরুণ সমাজকে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা দেশের জন্য একটি গুরুতর হুমকি। মূলত এই কারণেই পুরোনো আইনটি রহিত করে সময়োপযোগী ও কঠোর সাজার বিধান রেখে নতুন আইনটি আনা হয়েছে।
নতুন এই আইনে ‘অনলাইন জুয়া বা দূরবর্তী জুয়া’, ‘অনলাইন বেটিং’ (যেমন: স্পোর্টস বেটিং, লাইভ বেটিং, ক্যাসিনো বেটিং), ‘ক্রিপ্টোকারেন্সি’, ‘ঘোস্ট সিম’ এবং ‘ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট’ বা ডিজিটাল ওয়ালেটের সুনির্দিষ্ট আইনি সংজ্ঞা স্পষ্ট করা হয়েছে।
আইনের ধারা অনুযায়ী, জুয়ার উদ্দেশ্যে যেকোনো মাধ্যমে অর্থ জমা করা, উত্তোলন বা এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এছাড়া বিদেশি কোনো অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্মের দেশীয় প্রতিনিধি বা এজেন্ট হিসেবে কাজ করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুয়া সংক্রান্ত কোনো পেজ, গ্রুপ বা চ্যানেল পরিচালনা করাও সমানভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এখানেই শেষ নয়, জুয়ার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা সরঞ্জামাদি সরবরাহ করা, জুয়ার সাইটের বিজ্ঞাপন প্রচার এবং কোনো ক্লাব বা টুর্নামেন্টে জুয়াড়িদের স্পনসরশিপ বা অর্থায়নের ক্ষেত্রেও কঠোর কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এসব অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড, ৫ কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এই আইনের অধীনে সংঘটিত সব অপরাধকে ‘আমলযোগ্য’ এবং ‘অজামিনযোগ্য’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এসব অপরাধের বিচার মূলত সাইবার ট্রাইব্যুনাল কিংবা বিশেষ ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
এদিকে জুয়া প্রতিরোধে আলাদা বিশেষায়িত আইন তৈরি হওয়ায় ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ থেকেও একটি ধারা বিলুপ্ত করা হয়েছে। নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, সাইবার সুরক্ষা আইনের ২০ ধারাটি পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে, যে ধারায় আগে এই সংক্রান্ত অপরাধে এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান ছিল।
বিলের উদ্দেশ্য সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের সাইবার স্পেসকে নিরাপদ রাখতে মূলত পূর্বের আইনটি কাজ করছিল। তবে ডিজিটাল ও অফলাইন উভয় মাধ্যমের জুয়া এবং বেটিং সংক্রান্ত অপরাধগুলো আরও কঠোর ও সুনির্দিষ্টভাবে দমন করা প্রয়োজন। যেহেতু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন-২০২৬’ নামে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও বিস্তারিত আইন তৈরি করে ফেলেছে, তাই আইনি জটিলতা বা আইনের ওভারল্যাপিং এড়াতে সাইবার সুরক্ষা আইন থেকে পুরোনো ধারাটি বাদ দেওয়া হলো। এই সংশোধনী বিলটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে সংসদে জানানো হয়েছে।
মন্তব্য