খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ই জুন ২০২৬, ৩:২৫ পিএম

তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়লেও উৎপাদন সেই হারে ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লোডশেডিং বেড়ে জনজীবন, শিল্পকারখানা এবং কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির ঘাটতি, প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট, কয়লাভিত্তিক কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং কিছু কেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, তাপমাত্রা আরও বাড়লে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রোববার সারা দেশে গড়ে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল। এর আগে চলতি বছরের মে মাসেও প্রায় একই পরিমাণ ঘাটতির কারণে ব্যাপক লোডশেডিং হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কারণ বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও উৎপাদনের প্রধান জ্বালানি গ্যাসের সরবরাহ পর্যাপ্ত নয়। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানিও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
রাজধানী ঢাকায় এখনো লোডশেডিং তুলনামূলক সীমিত থাকলেও দেশের অধিকাংশ জেলা ও উপজেলায় পরিস্থিতি অনেক বেশি সংকটপূর্ণ। কোথাও কোথাও দিনের উল্লেখযোগ্য সময় বিদ্যুৎ থাকে না। বিশেষ করে শিল্প ও কৃষিনির্ভর এলাকাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক অঞ্চলে সেচ, খাদ্য সংরক্ষণ, ক্ষুদ্র শিল্প এবং ব্যবসা-বাণিজ্য বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে সার কারখানাসহ অন্যান্য খাতে গ্যাস ব্যবহারে সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ময়মনসিংহ অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং কমাতে ইউনাইটেড পাওয়ার কোম্পানির দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রোববার সংসদ সচিবালয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বিদ্যুৎ খাতের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। বৈঠকে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী, জ্বালানি সচিব, বিদ্যুৎ সচিবসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়।
পরে বিদ্যুৎমন্ত্রী জানান, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে এবং অন্য একটি ইউনিটেও স্বাভাবিকের তুলনায় কম বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের ঘাটতি আরও বেড়েছে। সংকট মোকাবিলায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খুলনায় ৩০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রও চালু করা হয়েছে, যাতে ঘাটতির কিছুটা হলেও প্রভাব কমানো যায়।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের মতে, অর্থ সংকট, গ্যাসের স্বল্পতা এবং কয়লাভিত্তিক দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রত্যাশিত উৎপাদন না পাওয়া বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সংস্থা ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, গত পাঁচ বছরে বিদ্যুৎ খাতে এত বড় চাপের পরিস্থিতি খুব কমই দেখা গেছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাসিন্দারা দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিংয়ে চরম দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন। ময়মনসিংহের ভালুকার বড়াই এলাকার বাসিন্দা রবিন বড়ুয়া বলেন, দিনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। রাতে কখন বিদ্যুৎ আসবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। এতে টেক্সটাইল কারখানা, কৃষি খামার এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
রাজধানীসংলগ্ন কেরানীগঞ্জের সাবান ফ্যাক্টরি এলাকার বাসিন্দা সোহেল আহমেদ জানান, সেখানে প্রতিদিন আট থেকে দশ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। তার প্রশ্ন, রাজধানীতে তুলনামূলক কম লোডশেডিং হলেও পাশের এলাকাগুলোতে কেন এত দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকে না।
একই ধরনের অভিযোগ এসেছে চট্টগ্রামের লোহাগড়া থেকেও। স্থানীয় বাসিন্দা ইমন আহমেদ বলেন, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ প্রায় থাকেই না। কখন বিদ্যুৎ ফিরবে, সেই অপেক্ষাতেই দিনের বড় একটি সময় কেটে যায়। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পাশাপাশি ব্যবসা, শিক্ষা এবং দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের পথ সহজ হবে। অন্যথায় গরম আরও বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
মন্তব্য