
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ককে দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির অন্যতম দৃঢ় কৌশলগত জোট হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সামরিক সহযোগিতা, কূটনৈতিক সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পারস্পরিক অবস্থানের কারণে এই সম্পর্ককে প্রায় অবিচ্ছেদ্য বলেই মনে করা হতো। তবে সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে সেই ধারণা নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান-সংক্রান্ত কূটনৈতিক তৎপরতা, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে নিয়ে তাঁর প্রকাশ্য সমালোচনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতা—সব মিলিয়ে ইসরায়েলে উদ্বেগ বাড়ছে।
ইসরায়েলের রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাবেক কূটনীতিক এবং নীতিনির্ধারণ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের যে সূক্ষ্ম পরিবর্তন শুরু হয়েছে, তা ভবিষ্যতে আরও বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। যদিও এখনো কেউ যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে চীন বা রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ার কথা বলছেন না, তবু দীর্ঘদিনের নির্ভরতার ভিত্তি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা ক্রমেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসছে।
এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে নিউইয়র্ক সিটির ডেমোক্রেটিক প্রাইমারির ফলাফলের পর। ইসরায়েলের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত মেয়র জোহরান মামদানির সমর্থন পাওয়া তিন ফিলিস্তিনপন্থী প্রার্থী কংগ্রেসনাল প্রাইমারিতে জয়ী হয়েছেন। তাঁরা ইসরায়েলপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করেন। বিষয়টি ইসরায়েলে কেবল একটি স্থানীয় নির্বাচনের ফল নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মানসিকতার পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্কে ইসরায়েলের কনসাল জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এবং বর্তমানে তেল আবিবের ডেপুটি মেয়র আসাফ জামির বলেন, এই ফলাফল তাঁকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। তাঁর মতে, বিজয়ী প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারে ইসরায়েলের কঠোর সমালোচনাকে প্রধান রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। অথচ জেরুজালেমের পর নিউইয়র্ককেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইহুদি-অধ্যুষিত নগর হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় কারণ ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধ। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই সংঘাতে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং সেখানে মানবিক সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিচারিক ও মানবাধিকার মহলেও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বৈধতা ও মানবিক প্রভাব নিয়ে বিস্তর বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েল সরকার বরাবরই বলে আসছে, হামাসের হামলার জবাবে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করেই তারা সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে। তাদের দাবি, হামাস ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান নেওয়ায় বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি বেড়েছে। তবে এই ব্যাখ্যা আন্তর্জাতিক মহলের সব অংশকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি এবং যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে।
আসাফ জামির অভিযোগ করেন, প্রতিদিনই ইসরায়েলিদের গণহত্যাকারী ও বর্ণবাদী হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তিনি নিজেকে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সমর্থক ও শান্তিকামী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আরও বেশি মানুষ এখন এই নেতিবাচক ধারণাকে সত্য বলে বিশ্বাস করছেন এবং সেই ভিত্তিতেই ভোট দিচ্ছেন। তাঁর মতে, এই মনোভাবের পরিবর্তনই সবচেয়ে উদ্বেগজনক।
তবে এই বক্তব্যকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভিন্নমতও রয়েছে। বহু মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক গাজায় ব্যাপক বেসামরিক হতাহতের ঘটনা, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকায় হামলা এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে প্রতিবন্ধকতা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগ জানিয়েছে। ইসরায়েল এসব অভিযোগের অনেকগুলোই প্রত্যাখ্যান করেছে অথবা সামরিক প্রয়োজনের যুক্তি তুলে ধরেছে। ফলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জনমতেও পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে। গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা কলেজের যৌথ জরিপে দেখা যায়, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বেশি সংখ্যক মার্কিন নাগরিক ইসরায়েলিদের তুলনায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন। একইভাবে গত এপ্রিলে পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মতামত দিয়েছেন, যেখানে ২০২২ সালে এই হার ছিল ৪২ শতাংশ।
নিউইয়র্কভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইসরায়েল পলিসি ফোরামের বিশ্লেষক মাইকেল কোপলোর মতে, কয়েকজন বামপন্থী আইনপ্রণেতার জয়ই মূল উদ্বেগ নয়; বরং এটি ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে ইসরায়েলবিষয়ক রাজনৈতিক অবস্থানের গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তাঁর ভাষায়, ইসরায়েলকে ঘিরে বিতর্ক এখন আর প্রান্তিক কোনো ইস্যু নয়, বরং নির্বাচনী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।
ডেমোক্রেটিক রাজনীতিকদের একটি বড় অংশের মতে, মানবাধিকার ও ফিলিস্তিনিদের অধিকারের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে নৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। জনমত জরিপকারী ডাহলিয়া শিন্ডলিন বলেন, বহু দশক ধরে এই বিশেষ সম্পর্ককে স্থায়ী ধরে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গাজা যুদ্ধের পর সেই ধারণা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। তাঁর মতে, সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ মনে করছে, ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটতে থাকলে এই বিশেষ সম্পর্ক আগের মতো অটুট রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
অন্যদিকে রিপাবলিকানদের একাংশের আপত্তি ভিন্ন ধরনের। তাঁদের মতে, ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে ক্রমশ বেশি জড়িয়ে ফেলছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, দুই দেশের জাতীয় স্বার্থ এখনো কতটা অভিন্ন।
সাবেক ইসরায়েলি কনসাল জেনারেল অ্যালন পিনকাস বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পদ হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু এখন ওয়াশিংটনে নতুন প্রশ্ন উঠছে—ইসরায়েল এখনো কি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি সম্পদ, নাকি ধীরে ধীরে কৌশলগত দায়ে পরিণত হচ্ছে?
তবে সব পরিবর্তনের মধ্যেও দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের জন্য অস্ত্র বিক্রি ও জরুরি সামরিক সহায়তার গতি বাড়িয়েছে। হামাস-সংক্রান্ত কূটনৈতিক আলোচনাতেও ওয়াশিংটন তেল আবিবকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরের বসতি স্থাপন ইস্যুতে চাপও তুলনামূলকভাবে সীমিত রাখা হয়েছে।
তার পরও ইসরায়েলে উদ্বেগ কমছে না। ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা এগিয়ে নিতে ট্রাম্প প্রশাসন আঞ্চলিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে কিছু সামরিক পদক্ষেপে সংযমের আহ্বান জানিয়েছে। একই সময়ে ইসরায়েলের নেতৃত্বও স্বীকার করতে শুরু করেছে যে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ও সামরিক সহায়তার ওপর অতীতের মতো নির্ভর করা সম্ভব নাও হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ধীরে ধীরে সেই নির্ভরতা কমানোর প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল সি কার্টজারের মতে, বর্তমানে জাতিসংঘে ইসরায়েলের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখনো দৃঢ় রয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, বর্তমান মার্কিন নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি নিজেদের রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকেও গুরুত্ব দিচ্ছে।
এই অনিশ্চয়তা এখন ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় আলোচ্য বিষয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের চোখে ইসরায়েল যদি ধীরে ধীরে কৌশলগত অংশীদারের বদলে বোঝা হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে, তবে সেটি দেশটির জন্য গভীর কূটনৈতিক সংকটের সূচনা হতে পারে।
তেল আবিবের ডেপুটি মেয়র আসাফ জামিরের ভাষায়, সবচেয়ে বড় উদ্বেগ সামরিক সহায়তা নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা। তাঁর মতে, বহু বছর ধরে ইসরায়েল বিশ্বাস করে এসেছে যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভরসা। সেই আস্থার ভিত্তিই যদি দুর্বল হতে শুরু করে, তবে তার প্রভাব কেবল কূটনীতিতে নয়, দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসেও গভীরভাবে প্রতিফলিত হবে।
> স্মরণে কথাসাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ
> দেশে হামে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি
> ওপ্টা অ্যানালিস্টের চোখে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের সেরা একাদশ
> হল দখল অভিযোগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাল্টাপাল্টি অবস্থান
> হরমুজ প্রণালির বিরোধ মেটাতে দোহায় বৈঠকে বসছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান
> জুলাইয়ে ‘ওভারলোড ফেস্টিভ্যালে’ মাতাবে দেশের আট রক ব্যান্ড
> ইলেকট্রনিক সংগীতচর্চায় নতুন দিগন্ত খুলল শিল্পকলা একাডেমির আয়োজন
> ট্রাম্পকে ‘লুজার’ ও ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ বলে তীব্র আক্রমণ করলেন জো বাইডেন
> রাম মন্দিরে কোটি কোটি টাকার অনুদান আত্মসাৎ, বিপাকে মোদি সরকার
> দুর্নীতি প্রতিরোধে তৃণমূলের শক্তি: এবার ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি গঠন
> প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর দেশের ভাবমুর্তি ক্ষতিগ্রস্থ করেছে
> স্মরণ আঁধারের আলোকবর্তিকা শহীদ জননী জাহানারা ইমাম
> হাসানুল হক ইনুর মামলার রায় আগামী ৩০ জুন
> কার্বন ক্রেডিট বিক্রি: ২৫ কোটি গাছ রোপণে বাংলাদেশের বিলিয়ন ডলারের আয়ের সম্ভাবনা
> লোকসান সইতে না পেরে সিরাজগঞ্জে অনির্দিষ্টকালের জন্য ডিম বিক্রি বন্ধ
> বীমা খাতে এআই ব্যবহারে নজরদারি বাড়াচ্ছে ভারত
> প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষক সংকটে সরকারের আপাত সমাধান পরিকল্পনা
> লিংকন ছাড়াই আর্টসেলের নতুন অধ্যায় শুরু
© কপিরাইট ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
মন্তব্য