খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ই জুন ২০২৬, ৬:২৪ পিএম

এশিয়ার বীমা শিল্পে চলতি সপ্তাহে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। ব্যক্তিগত আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারে নতুন চ্যালেঞ্জ, প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নতুন নীতিগত উদ্যোগ—সব মিলিয়ে ২৩ থেকে ২৬ জুনের সপ্তাহটি ছিল বীমা খাতের জন্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, এশিয়ার মানুষ এখন উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদ পাওয়ার চেয়ে নিজের আর্থিক সক্ষমতা ও স্বনির্ভরতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ২০২৬ সালের ম্যানুলাইফ এশিয়া কেয়ার সার্ভেতে এ তথ্য উঠে এসেছে। ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে পরিচালিত এই জরিপে এশিয়ার নয়টি বাজারের ৯ হাজারেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নেন।
জরিপ অনুযায়ী, উত্তরদাতারা মনে করেন জীবনের শেষ পর্যায়ে গড়ে ১৩ থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত তাদের কোনো না কোনো ধরনের শারীরিক পরিচর্যা বা আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা এবং অবসর-পরবর্তী আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মানুষ এখন আগের তুলনায় বেশি সচেতন হচ্ছেন। এই প্রবণতা বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন ধরনের সেবা ও পণ্যের চাহিদা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
করপোরেট পর্যায়েও উল্লেখযোগ্য একটি পরিবর্তনের ঘোষণা এসেছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক ইনকাম ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড তাদের ডিজিটাল বীমা প্ল্যাটফর্ম ‘হাইভ’ (HIVE) এমবেড ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপ হোল্ডিংস প্রাইভেট লিমিটেডের (EFGH) কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এই লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
যদিও চুক্তির আর্থিক মূল্য প্রকাশ করা হয়নি, তবে ইএফজিএইচ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে তালিকাভুক্ত একটি স্পেশাল পারপাস অ্যাকুইজিশন কোম্পানির (SPAC) সঙ্গে ব্যবসায়িক একীভূতকরণ চুক্তি করেছে। সম্ভাব্যভাবে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানটির ইকুইটি মূল্য প্রায় ৪২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৫৪৮ দশমিক ৭ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, বীমা খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় পরিচালিত এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এআইভিত্তিক সার্চ ইঞ্জিনে করা নির্দিষ্ট ও বিস্তারিত বীমা-সংক্রান্ত প্রশ্নের প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনো বীমা প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডের নাম উল্লেখই থাকে না। ফলে সম্ভাব্য গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি বড় সুযোগ যেমন তৈরি হচ্ছে, তেমনি প্রতিযোগিতাও বাড়ছে।
ব্র্যান্ড মনিটরিং প্ল্যাটফর্ম সোমান্ট্রার প্রকাশিত মে ২০২৬ সালের ‘এআই সার্চ ভিজিবিলিটি রিপোর্ট’-এ গুগলের এআই ওভারভিউ এবং চ্যাটজিপিটিতে অস্ট্রেলিয়ার ২০টি বীমা ব্র্যান্ডকে ঘিরে ৩৪ হাজার ২৭৮টি ভোক্তা-আলোচনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রচলিত সার্চ ইঞ্জিনের পাশাপাশি এআইভিত্তিক তথ্য অনুসন্ধানের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ায় বীমা কোম্পানিগুলোকে তাদের ডিজিটাল উপস্থিতি নতুনভাবে সাজাতে হবে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকিও বিশ্বব্যাপী বীমা শিল্পের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা মুডিজের এক নতুন প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে আগামী দুই দশকে বীমার আওতার বাইরে থাকা আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ সর্বোচ্চ ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং বীমা কোম্পানিগুলোর পরিশোধিত দাবির মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে, সেটিই এখন ‘ইনস্যুরেন্স প্রোটেকশন গ্যাপ’ হিসেবে পরিচিত। এই ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
এদিকে, এআই ব্যবহারে ঝুঁকি কমাতে দক্ষিণ কোরিয়ার ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস কমিশন নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান কওন দে-ইয়ং জানিয়েছেন, নতুন কাঠামোয় তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে—এআই ব্যবহারে সবার জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা, তথ্য ব্যবস্থাপনায় স্পষ্ট জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং সাইবার নিরাপত্তাজনিত অনিশ্চয়তা মোকাবিলা।
সপ্তাহের শেষদিকে সিঙ্গাপুরের মনিটারি অথরিটি অব সিঙ্গাপুর (এমএএস) বীমা খাতে ‘প্রোটেক্টেড সেল কোম্পানি’ (পিসিসি) নামে নতুন করপোরেট কাঠামো চালুর বিষয়ে পরামর্শ প্রক্রিয়া শুরু করার ঘোষণা দেয়। এই কাঠামোর মাধ্যমে একটি মূল প্রতিষ্ঠানের অধীনে পৃথক সেলে বিভিন্ন ধরনের সম্পদ, দায় এবং ঝুঁকি আলাদাভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। একই অবকাঠামো ব্যবহার করেও বিভিন্ন ঝুঁকির জন্য স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যাবে, যা বিকল্প ঝুঁকি স্থানান্তর ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও সম্প্রসারিত করতে সহায়তা করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, চলতি সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে যে এশিয়ার বীমা খাত দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে গ্রাহকদের চাহিদা ও আর্থিক পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসছে, অন্যদিকে প্রযুক্তি, জলবায়ুজনিত ঝুঁকি এবং নতুন নিয়ন্ত্রক কাঠামো আগামী দিনের বীমা শিল্পের রূপ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মন্তব্য