খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ই জুন ২০২৬, ২:১৭ পিএম

ফ্রান্সে প্রথমবারের মতো প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত একজন রোগী শনাক্ত হওয়ার ঘটনায় দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সতর্কতা আরও জোরদার করা হয়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তি একজন চিকিৎসক, যিনি সম্প্রতি কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার পর দেশে ফিরে আসেন। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে একটি বিশেষায়িত সংক্রামক রোগ চিকিৎসা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে এবং নিবিড় চিকিৎসা তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে।
ফরাসি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রোগী শনাক্ত হওয়ার পরপরই তাকে সম্পূর্ণ আইসোলেশনে রাখা হয়, যাতে ভাইরাসটি অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার কোনো সুযোগ না থাকে। একই সঙ্গে রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে ব্যাপক অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। যাদের শনাক্ত করা হবে, তাদের ২১ দিন পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। কারণ ইবোলা সংক্রমণের ক্ষেত্রে সাধারণত এই সময়ের মধ্যেই উপসর্গ প্রকাশ পায়।
স্বাস্থ্য বিভাগ আরও জানিয়েছে, কঙ্গো থেকে সম্প্রতি ফ্রান্সে ফিরে আসা স্বাস্থ্যকর্মী ও মানবিক সহায়তাকর্মীদের ওপর বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখা হয়েছে, যাতে সম্ভাব্য কোনো সংক্রমণ দ্রুত শনাক্ত করা যায় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ সংক্রামক রোগ হিসেবে পরিচিত ইবোলা ভাইরাস মানুষের শরীরে জ্বর, তীব্র দুর্বলতা, বমি, ডায়রিয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণের মতো গুরুতর উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা না পেলে রোগটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। যদিও আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির ফলে মৃত্যুহার আগের তুলনায় কমেছে, তবুও রোগটি এখনও বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় ইবোলা প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রবিন্দু কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র। দেশটিতে গত মে মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন প্রাদুর্ভাব ঘোষণা করা হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এর আগেই ভাইরাসটি স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল। এখন পর্যন্ত সেখানে এক হাজারের বেশি সংক্রমণ এবং আড়াই শতাধিক মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল হিসেবে পূর্বাঞ্চলের ইতুরি প্রদেশকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান প্রাদুর্ভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মীও আক্রান্ত হয়েছেন। এতে রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে চলমান সশস্ত্র সংঘাত, ব্যাপক জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি এবং দুর্বল স্বাস্থ্য অবকাঠামো। এসব কারণে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চলমান প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী ভাইরাসের ধরনটি বিরল ‘বান্ডিবুগিও’ প্রজাতি, যার বিরুদ্ধে এখনো কোনো নির্দিষ্ট অনুমোদিত টিকা বা শতভাগ কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি নেই। ফলে সংক্রমণ প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং রোগীর নিবিড় পরিচর্যাই বর্তমানে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এদিকে কঙ্গোর প্রতিবেশী উগান্ডাতেও সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, যাত্রী স্ক্রিনিং এবং জরুরি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং আক্রান্ত দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।
তবে ফরাসি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জনগণকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউরোপের সাধারণ মানুষের জন্য সংক্রমণের ঝুঁকি অত্যন্ত কম। এখন পর্যন্ত ফ্রান্সে স্থানীয়ভাবে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তারপরও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে নজরদারি, সংস্পর্শ অনুসন্ধান এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে।
মন্তব্য