নওগাঁবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় অবকাঠামোগত উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে পৌঁছেছে। জাতীয় সংসদে বিল পাসের মধ্য দিয়ে ২০২৩ সালে যাত্রা শুরু করা এই বিশ্ববিদ্যালয় চলতি ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ৮০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো, একাডেমিক পরিবেশ ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে সোমবার (১৮ মে) নওগাঁ জেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো মহাপরিকল্পনা এবং একাডেমিক মহাপরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কী ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও অংশীজনদের মতামত গ্রহণের মাধ্যমে পরিকল্পনাকে আরও সময়োপযোগী ও কার্যকর করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।
সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন মহাপরিকল্পনার প্রাথমিক ধারণা উপস্থাপন করে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান শেলটেক কনসালটেন্ট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সমন্বিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ করছে। এ লক্ষ্যে ৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি সমন্বিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্পের ধারণাপত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রকল্পটির অনুমোদিত বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত।
মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাছানাত আলী। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক খন্দকার শাহরিয়ার রহমান সভা সঞ্চালনা করেন। সভায় বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য ও নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হুদা বাবুল, নওগাঁ-৬ আসনের সংসদ সদস্য শেখ রেজাউল ইসলাম, নওগাঁ-২ আসনের সংসদ সদস্য এনামুল হক, নওগাঁ জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আবু বক্কর সিদ্দিক, বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. কুদরত-ই জাহান এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রহমান রিপনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা।
সভায় শেলটেক কনসালটেন্ট লিমিটেডের স্থপতি মুস্তাসিম মাহমুদ খান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রাথমিক রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সরকার ৯৭ একর জমি অধিগ্রহণের প্রশাসনিক অনুমোদন দিয়েছে। ওই জমির ওপর আগামী ৫০ বছরের প্রয়োজন বিবেচনায় একটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছয়তলা বিশিষ্ট পাঁচটি একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি পাঁচতলা বিশিষ্ট একটি প্রশাসনিক ভবন, শিক্ষার্থীদের জন্য মোট ছয়টি আবাসিক হল—যার মধ্যে ছাত্রদের জন্য তিনটি এবং ছাত্রীদের জন্য তিনটি ছয়তলা ভবন থাকবে। এছাড়া একটি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ভবনসহ মোট ৪৫টি ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত মোট জমির ৫৩ শতাংশ সবুজ অঞ্চল, উন্মুক্ত মাঠ ও খোলা স্থান হিসেবে সংরক্ষণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নির্বাচিত স্থানটি অপেক্ষাকৃত নিম্নাঞ্চল হওয়ায় জলাবদ্ধতা ও প্লাবন রোধে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ জন্য ক্যাম্পাসের ভেতরে প্রশস্ত খাল রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক থাকে এবং আশপাশের এলাকার জলপ্রবাহও ব্যাহত না হয়।
সভায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাছানাত আলী বলেন, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ইতোমধ্যে একাধিক প্রকল্প প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এসব প্রকল্প সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) সবুজ পাতায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা। সম্ভাব্য বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত।
তিনি আরও জানান, এসব প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন নির্ভর করছে সমন্বিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্পের ধারণাপত্রের ওপর। শেলটেক কনসালটেন্ট লিমিটেড ইতোমধ্যে উন্নয়ন মহাপরিকল্পনার প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করেছে। চূড়ান্ত পরিকল্পনা প্রণয়নের আগে স্থানীয় অংশীজনদের মতামত গ্রহণের লক্ষ্যেই এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়েছে।
সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য ও সংসদ সদস্য ফজলে হুদা বাবুল বলেন, একবিংশ শতাব্দীর উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার চাহিদা পূরণে নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়কে যুগোপযোগীভাবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য জনপ্রতিনিধিরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পাশে থাকবেন।
নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে জেলার উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন। এর মাধ্যমে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হওয়ার পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের শিক্ষা ও জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
