সনদের ভিড়ে হারিয়ে যায় বাস্তব দক্ষতার মূল্য

শিক্ষা মানুষের জ্ঞান, সক্ষমতা ও জীবিকার পথ নির্মাণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—তিন ক্ষেত্রেই শিক্ষার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। একটি দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা শুধু ডিগ্রি প্রদান করে না; এটি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নের গতিপথ নির্ধারণ করে। কিন্তু বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ক্রমেই সামনে আসছে—উচ্চশিক্ষা কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করছে, নাকি তা কেবল সনদ অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে?

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছে। তারা উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে কর্মজীবনে প্রবেশের প্রত্যাশা নিয়ে এগিয়ে যায়। তবে বাস্তবে দেখা যায়, ডিগ্রি অর্জনের পরও অনেক শিক্ষার্থী চাকরির বাজারে কাঙ্ক্ষিত অবস্থান তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাদের শিক্ষাগত সনদ থাকলেও বাস্তব দক্ষতার ঘাটতি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি খাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও গবেষণা সংস্থাগুলো দক্ষ মানবসম্পদের অভাবের কথা নিয়মিতভাবে তুলে ধরছে। ফলে একদিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতার সংকট বিদ্যমান থাকছে।

এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার দিকে ইঙ্গিত করে। দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম এখনো তত্ত্বনির্ভর এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক। মুখস্থভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল অর্জন করলেও বাস্তব সমস্যার বিশ্লেষণ, সৃজনশীল চিন্তা ও ব্যবহারিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা বইয়ের জ্ঞান আয়ত্ত করতে সক্ষম হলেও কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বাস্তব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পায় না।

বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার, অটোমেশন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা কর্মক্ষেত্রের ধরন বদলে দিয়েছে। ডেটা বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি, ডিজিটাল বিপণন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও উদ্ভাবনী উদ্যোক্তা উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রগুলো নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় শুধু পুঁথিগত জ্ঞান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বাস্তব দক্ষতা, অভিযোজনক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো শিল্পখাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। সেখানে শিক্ষাক্রম প্রণয়নে শিল্পখাতের অংশগ্রহণ থাকে, শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা থাকে এবং গবেষণার ফল সরাসরি শিল্পোন্নয়নে প্রয়োগ করা হয়। বাংলাদেশে এ ধরনের সমন্বয় এখনো পর্যাপ্ত নয়। ফলে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে বাস্তব কর্মপরিবেশে গিয়ে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়।

কর্মমুখী শিক্ষা বলতে কেবল কারিগরি বা প্রযুক্তিগত শিক্ষা বোঝায় না। এটি এমন একটি সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা, যা শিক্ষার্থীকে বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতা দেয়। একজন শিক্ষার্থী যেন তার অর্জিত জ্ঞান ব্যবহার করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে পারে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে—সেই প্রস্তুতিই কর্মমুখী শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।

এই লক্ষ্য অর্জনে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমে মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। পাঠ্যসূচিতে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা, প্রকল্পকেন্দ্রিক মূল্যায়ন এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানভিত্তিক শিক্ষণ পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শুধুমাত্র লিখিত পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর না করে শিক্ষার্থীর বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সৃজনশীলতা এবং বাস্তব প্রয়োগ দক্ষতাকে মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ চালু করা সময়োপযোগী পদক্ষেপ হতে পারে। বাস্তব কর্মপরিবেশে কাজ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পেশাগত দায়িত্ববোধ, সময় ব্যবস্থাপনা, দলগত কাজ এবং যোগাযোগ দক্ষতা অর্জন করে। একইসঙ্গে তারা কর্মক্ষেত্রের বাস্তব চাহিদা সম্পর্কে ধারণা লাভ করে, যা তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সহায়ক হয়।

ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং ও স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠাও অত্যন্ত জরুরি। অনেক শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী কোন খাতে নিজেদের দক্ষতা প্রয়োগ করতে পারবে, সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পায় না। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যদি সিভি প্রস্তুতকরণ, সাক্ষাৎকার দক্ষতা, ভাষাগত সক্ষমতা, ডিজিটাল দক্ষতা ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তাহলে শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনে আরও প্রস্তুত হয়ে প্রবেশ করতে পারবে।

গবেষণার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু ডিগ্রি প্রদানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, জ্ঞানচর্চা, উদ্ভাবন ও জাতীয় সমস্যা সমাধানের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কৃষি, স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তি, নগরায়ণ ও শিল্পোন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণার কার্যকর প্রয়োগ দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে উদ্যোক্তা শিক্ষার প্রসার অপরিহার্য। রাষ্ট্র এককভাবে সবার কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারে না। তাই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্টার্টআপ ইনকিউবেশন সেন্টার, উদ্ভাবনী গবেষণা তহবিল ও উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করা গেলে তরুণদের নতুন উদ্যোগ গ্রহণে উৎসাহিত করা সম্ভব হবে।

শিক্ষকদের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক শুধু তথ্য সরবরাহকারী নন; তিনি শিক্ষার্থীর দিকনির্দেশক ও সক্ষমতা বিকাশের সহায়ক। তাই শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ এবং শিল্পখাতের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে।

রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেও উচ্চশিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসারে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বিদেশমুখী মেধাপ্রবাহও কমানো সম্ভব হতে পারে।

বর্তমান যুগে ভাষাগত দক্ষতা ও ডিজিটাল সক্ষমতা ছাড়া কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করা কঠিন। তাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ দক্ষতা এবং ভাষা শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। একইসঙ্গে নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার শিক্ষাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের তরুণ সমাজ দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাদের দক্ষ, উদ্ভাবনী ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে দেশ একটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যেতে পারবে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ডিগ্রি প্রদানের গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব দক্ষতা উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

সনদ তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা বাস্তব সক্ষমতায় রূপ নেবে। উচ্চশিক্ষা তখনই সফল হবে, যখন তা শিক্ষার্থীদের শুধু চাকরির প্রত্যাশা নয়, কর্মজীবনের বাস্তব প্রস্তুতি ও জাতীয় উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখার সামর্থ্য দেবে। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সামনে এটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনার ক্ষেত্র।

প্রফেসর ড. মোহাঃ হাছানাত আলী
উপাচার্য,নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়