চট্টগ্রাম মহানগরীর বায়েজিদ থানা এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিবর্ষণের ঘটনায় গুরুতর আহত ১১ বছর বয়সী শিশু রেশমি আক্তারের শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। বর্তমানে সে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ড নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর জানিয়েছেন যে, শিশুটির চোখের ভেতরে আটকে থাকা গুলিটি অপসারণ করা বর্তমানে অসম্ভব। গুলিটি রেশমির চোখ দিয়ে প্রবেশ করে মস্তিষ্কের অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশে গিয়ে বিদ্ধ হয়েছে, যা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বের করতে গেলে জীবনহানির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
Table of Contents
মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত ও বর্তমান শারীরিক পরিস্থিতি
শনিবার শিশু রেশমির অবস্থা পর্যালোচনায় একটি উচ্চপর্যায়ের মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। দীর্ঘক্ষণ পর্যবেক্ষণের পর বোর্ডের সদস্যরা সর্বসম্মতিক্রমে অস্ত্রোপচার না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। রোববার (১০ মে) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি ও ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. বাকি বিল্লাহ গণমাধ্যমকে জানান, শিশুটির অবস্থা শুরু থেকেই আশঙ্কাজনক। তিনি বলেন, “শিশু রেশমি বর্তমানে প্রায় ‘ব্রেন-ডেড’ বা মস্তিষ্ক মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। তার চেতনার মাত্রা (GCS) প্রায় শূন্যের কোঠায় এবং শরীরের স্বাভাবিক রক্তচাপ নেই। এই অবস্থায় কোনো ধরনের অস্ত্রোপচার পরিচালনা করা সম্ভব নয়।”
চিকিৎসকদের মতে, গুলিটি চোখ ভেদ করে মাথার গভীরে পেছনের দিকে এমন এক অবস্থানে আটকে আছে, যা মস্তিষ্কের মূল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস ও জীবন রক্ষাকারী যন্ত্রের মাধ্যমে তাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে, তবে তার শারীরিক প্রতিক্রিয়া আশাব্যঞ্জক নয়।
মর্মান্তিক ঘটনার প্রেক্ষাপট
গত বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১১টার দিকে বায়েজিদ থানার রৌফাবাদ কলোনির শহীদ মিনার গলি এলাকায় এই সহিংস ঘটনাটি ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, অজ্ঞাত পরিচয় ৪-৫ জন সশস্ত্র দুর্বৃত্ত মো. হাসান ওরফে রাজু নামের এক যুবককে লক্ষ্য করে তাড়া করছিল। সন্ত্রাসীরা রাজুকে লক্ষ্য করে পেছন থেকে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসান নিহত হন। এই তাড়া পাল্টা তাড়া ও গুলিবর্ষণের মাঝপথে পড়ে যায় শিশু রেশমি। সন্ত্রাসীদের ছোড়া একটি লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলি সরাসরি রেশমির চোখে বিদ্ধ হয়।
আহত রেশমিকে তাৎক্ষণিকভাবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। উন্নত চিকিৎসার আশায় সেখান থেকে তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছিল। তবে পরিস্থিতির জটিলতা বিবেচনায় একদিন পর পুনরায় তাকে অস্ত্রোপচারের উদ্দেশ্যে চমেক হাসপাতালে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু বর্তমান শারীরিক অবস্থায় কোনো অস্ত্রোপচার সম্ভব হচ্ছে না বলে চিকিৎসকরা স্পষ্ট জানিয়েছেন।
রেশমির পারিবারিক ও ব্যক্তিগত পরিচয়
রেশমি আক্তার বায়েজিদের শহীদ মিনার গলি এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা রিয়াজ আহমেদ ও সাবেরা বেগম দম্পতির কনিষ্ঠ সন্তান। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সে সবার ছোট এবং স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। অত্যন্ত মেধাবী ও চঞ্চল হিসেবে পরিচিত রেশমি সেই রাতে কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল না। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার সময় তার মা সাবেরা বেগমের জন্য বাসা থেকে পান কিনতে বের হয়েছিল সে। রাস্তার ওপারেই পানের দোকান থেকে পান নিয়ে ফেরার পথে সে ঘাতক গুলির মুখে পড়ে।
রেশমির পিতা রিয়াজ আহমেদ পেশায় একজন ক্ষুদ্র সবজি ব্যবসায়ী। সাধারণ এই পরিবারের একমাত্র ভরসা ও স্নেহের পাত্রীর এমন পরিণতিতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনরা রেশমির জীবন বাঁচাতে দেশবাসীর কাছে দোয়া প্রার্থনা করেছেন এবং এই বর্বরোচিত ঘটনার জন্য দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপ ও তদন্ত
বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পর থেকেই ঘাতক সন্ত্রাসীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ঘটনার মূল লক্ষ্যবস্তু মো. হাসান ওরফে রাজু হত্যার নেপথ্যে কোনো পূর্বশত্রুতা বা অপরাধী চক্রের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি গ্রহণ করেছে। বায়েজিদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জনাকীর্ণ আবাসিক এলাকায় এভাবে গুলিবর্ষণ ও একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন বিপন্ন হওয়ার ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনায় ইতিমধ্যে একটি হত্যা মামলা এবং শিশু আহতের ঘটনায় পৃথক আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বর্তমানে রেশমি চমেক হাসপাতালের আইসিইউ-এর ১১ নম্বর শয্যায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে রয়েছে। চিকিৎসকরা প্রতি মুহূর্তে তার শারীরিক পরিবর্তনগুলো পর্যবেক্ষণ করছেন, যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে অলৌকিক কোনো উন্নতির আশাতেই দিন গুনছেন তারা। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে, যেখানে পান কিনতে গিয়েও একটি শিশুকে ঘাতক গুলির শিকার হতে হচ্ছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত রেশমির শারীরিক অবস্থার কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি।
