রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে (১৪) প্রলোভন দেখিয়ে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৯ মে) দিবাগত রাতে উপজেলার একটি নিভৃত মাঠে এই বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার পর এলাকাবাসী অভিযুক্ত দুই বন্ধুর মধ্যে নাহিদুল ইসলাম (২০) নামে একজনকে মোটরসাইকেলসহ হাতেনাতে আটক করে রোববার (১০ মে) সকালে পুলিশে সোপর্দ করেছে। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী কিশোরীর মা বাদী হয়ে গোয়ালন্দ ঘাট থানায় দুইজনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেছেন।
ঘটনার বিবরণ ও অভিযুক্তদের পরিচয়
পুলিশ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী কিশোরী স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথে গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের জনৈক রায়হান শেখের (২০) সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শনিবার রাত আনুমানিক ১০টার দিকে রায়হান তার বন্ধু নাহিদুল ইসলামকে সাথে নিয়ে ওই কিশোরীর বাড়ির সামনে উপস্থিত হন। রায়হান ওই কিশোরীকে মোটরসাইকেলে করে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে প্রলুব্ধ করেন।
কিশোরীটি সরল বিশ্বাসে তাদের সাথে মোটরসাইকেলে চড়লে অভিযুক্তরা তাকে বাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে একটি নির্জন মাঠে নিয়ে যান। সেখানে রায়হান ও তার বন্ধু নাহিদুল পালাক্রমে ওই কিশোরীকে ধর্ষণ করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। রাত আনুমানিক ১২টার দিকে অভিযুক্তরা কিশোরীকে তার এলাকায় নামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় কিশোরীর অস্বাভাবিক আচরণ ও পরিস্থিতি সন্দেহজনক মনে হলে স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের গতিরোধ করেন।
জনরোষের মুখে মূল অভিযুক্ত রায়হান শেখ কৌশলে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও তার বন্ধু নাহিদুল ইসলামকে মোটরসাইকেলসহ আটক করেন এলাকাবাসী। নাহিদুল ইসলাম গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের ফকিরপাড়া এলাকার এলেম মণ্ডলের ছেলে। তিনি বর্তমানে উপজেলার ছোটভাকলা ইউনিয়নের বিলডাঙ্গা গ্রামে তার নানাবাড়িতে থেকে একটি কলেজে পড়াশোনা করেন।
আটক ও আইনি পদক্ষেপ
নাহিদুল ইসলামকে আটকের পর স্থানীয়রা তাকে মাতুব্বর ফরিদ মুন্সীর বাড়িতে আটকে রাখেন। রোববার সকালে বিষয়টি থানা পুলিশকে অবহিত করা হলে গোয়ালন্দ ঘাট থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযুক্তকে হেফাজতে নেয়। দুপুর নাগাদ ভুক্তভোগী কিশোরীর মা বাদী হয়ে রায়হান শেখ ও নাহিদুল ইসলামের নাম উল্লেখ করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।
গোয়ালন্দ ঘাট থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) রাশিদুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, কিশোরীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের অভিযোগে নাহিদুল নামের এক তরুণকে গ্রেফতার করে থানায় আনা হয়েছে। মামলার অপর আসামি রায়হান শেখকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশের একাধিক দল অভিযান পরিচালনা করছে। তিনি আরও জানান, ভুক্তভোগী কিশোরীকে শারীরিক পরীক্ষা বা মেডিকেল টেস্টের জন্য রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে প্রেরণের প্রক্রিয়া চলছে। গ্রেফতারকৃত আসামিকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে পাঠানোর প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও বর্তমান পরিস্থিতি
ঘটনার পর থেকে এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল এবং অভিভাবকরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন। ভুক্তভোগী কিশোরীর পরিবার বর্তমানে চরম মানসিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, কিশোরীর জবানবন্দি রেকর্ড করা হবে এবং ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট সকল আলামত সংগ্রহ করা হচ্ছে।
নারী অধিকার কর্মীদের মতে, প্রেমের সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ সামাজিক অবক্ষয়েরই বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় কিশোরীদের নিরাপত্তার বিষয়টি আরও জোরালোভাবে দেখা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার মূল হোতা রায়হানকে গ্রেফতার না করা পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং তদন্তের মাধ্যমে সকল তথ্য উদ্ঘাটন করা হবে। বর্তমানে মামলার এজাহারভুক্ত গ্রেফতারকৃত আসামিকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে এবং উদ্ধারকৃত মোটরসাইকেলটি পুলিশের জব্দ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই বর্বরোচিত ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পুলিশ বদ্ধপরিকর বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
