টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের নারী দল: দুই পেসার নিয়ে পরিকল্পনা

আসন্ন আইসিসি নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচক কমিটি চূড়ান্ত দল ঘোষণা করেছে। আজ রোববার (১০ মে) মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে প্রধান নির্বাচক সাজ্জাদ আহমেদ শিপন ১৫ সদস্যের এই দল ও বিশ্বকাপের পরিকল্পনা গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন। নিগার সুলতানা জ্যোতির নেতৃত্বে বাংলাদেশ নারী দল চলতি মাসেই বিশ্বকাপের উদ্দেশ্যে দেশত্যাগ করবে। মূল আসরে মাঠে নামার আগে দলটি একটি ত্রিদেশীয় সিরিজেও অংশগ্রহণ করবে, যা তাদের কন্ডিশনের সাথে মানিয়ে নিতে সহায়তা করবে।

স্কোয়াড বিশ্লেষণ ও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন

ঘোষিত এই স্কোয়াডে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সর্বশেষ সিরিজ থেকে বাদ পড়েছেন অভিজ্ঞ শারমিন সুলতানা। তার পরিবর্তে প্রথমবারের মতো জাতীয় দলে ডাক পেয়েছেন উদীয়মান ক্রিকেটার তাজ নেহার। তবে দল ঘোষণার পর সবচেয়ে বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে স্কোয়াডে বিশেষজ্ঞ পেসারের সংখ্যা। নির্বাচকরা মূল পেসার হিসেবে মাত্র দুজনকে দলে রেখেছেন। অলরাউন্ডার রিতু মনিকে অতিরিক্ত পেসার বা বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বিশ্বকাপে পেস আক্রমণের এমন সংক্ষিপ্ত বহর নিয়ে ক্রিকেট মহলে বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে।

প্রধান নির্বাচকের অদ্ভুত ব্যাখ্যা ও বাস্তবতা

বিশ্বকাপের মতো একটি বড় আসরে যেখানে ইংল্যান্ডের কন্ডিশনে খেলা হবে, সেখানে মাত্র দুজন পেসার নিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর উত্তরে প্রধান নির্বাচক সাজ্জাদ আহমেদ শিপন দেশের ক্রিকেট পাইপলাইনের দুর্বলতাকে পরোক্ষভাবে দায়ী করেছেন। তিনি জানান, বর্তমানে পর্যাপ্ত মানসম্মত পেসার খুঁজে পাওয়া একটি চ্যালেঞ্জ। তবে পাইপলাইনের এই সংকটের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “এখন যদি আমি এ নিয়ে বিস্তারিত বলি, তবে আমাকে এবং জাতীয় দলকে ছোট করা হবে। বাস্তবতা হলো আমাদের পাইপলাইনের খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীর গতির।”

শিপন মনে করেন, ইংল্যান্ডের বর্তমান কন্ডিশন এখন আর আগের মতো বোলারদের অতিরিক্ত সুইং বা মুভমেন্ট প্রদান করে না। তার মতে, গ্রীষ্মকালীন ইংল্যান্ডের উইকেটগুলো এখন অনেকটাই উপমহাদেশের উইকেটের মতো আচরণ করে। ফলে স্পিনাররাই সেখানে বেশি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

গেম প্ল্যান ও কন্ডিশন বিবেচনা

নির্বাচক কমিটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ দল স্পিন-নির্ভর আক্রমণ নিয়েই মাঠে নামবে। প্রধান নির্বাচকের ভাষ্যমতে, একাদশে একজন মাত্র বিশেষজ্ঞ পেসার খেলিয়ে বাকি কোটা স্পিনারদের দিয়ে পূরণ করার চিন্তা রয়েছে তাদের। তিনি বলেন:

“আমাদের প্রাথমিক ইচ্ছা আছে ইংল্যান্ডের কন্ডিশনে স্পিনারদের প্রাধান্য দেওয়ার। যদি বল প্রত্যাশিতভাবে ঘুরে, তবে একজন পেসার এবং চারজন স্পিনার নিয়ে আমরা কৌশল সাজাতে পারি। আর যদি কন্ডিশন খুব বেশি ভিন্ন হয়, তবে বড়জোর দুই পেসার খেলানো হতে পারে।”

রিকভারি ও দীর্ঘ বিরতির সুবিধা

বিশ্বকাপের সূচিতে ম্যাচগুলোর মাঝে পর্যাপ্ত বিরতি থাকায় খেলোয়াড়দের ওপর শারীরিক চাপ কম পড়বে বলে মনে করছেন নির্বাচকরা। সাজ্জাদ আহমেদ শিপন জানান, “ম্যাচের মাঝে অনেক বিরতি থাকায় আমাদের ক্রিকেটারদের রিকভারির যথেষ্ট সুযোগ থাকবে। এতে করে অল্প সংখ্যক পেসার নিয়েও পুরো টুর্নামেন্ট সামলানো সম্ভব হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।”

ইংল্যান্ডের কন্ডিশন ও স্পিন নির্ভরতা

ঐতিহাসিকভাবে ইংল্যান্ডের কন্ডিশন পেস সহায়ক হলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইসিসি ইভেন্টগুলোতে ব্যবহৃত উইকেটগুলো শুকনো ও ব্যাটিং বান্ধব করার প্রবণতা দেখা গেছে। বাংলাদেশ দলের কৌশল মূলত এই শুষ্ক উইকেটকে কেন্দ্র করে। মারুফা আক্তার ও জাহানারা আলমের মতো পেসারদের ওপর বড় দায়িত্ব থাকলেও, নাহিদা আক্তার ও ফাহিমা খাতুনদের মতো অভিজ্ঞ স্পিনাররাই হবে টাইগ্রেসদের মূল অস্ত্র।

ত্রিদেশীয় সিরিজের গুরুত্ব

বিশ্বকাপের আগে ত্রিদেশীয় সিরিজটি বাংলাদেশের জন্য প্রস্তুতির বড় মঞ্চ। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ পাবেন অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি। মূলত এই সিরিজের পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করেই বিশ্বকাপের মূল একাদশে পেসার ও স্পিনারের ভারসাম্য চূড়ান্ত করা হবে। নির্বাচকদের এই “স্পিন তত্ত্বে” বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপে কতটা সফল হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। অভিজ্ঞ শারমিন সুলতানার অভাব তাজ নেহার পূরণ করতে পারবেন কি না, সেটিও দলের ব্যাটিং গভীরতার জন্য একটি বড় পরীক্ষা হবে। সব মিলিয়ে সীমাবদ্ধ পাইপলাইন আর কন্ডিশনের মারপ্যাঁচে এক ভিন্নধর্মী পরিকল্পনা নিয়ে বিশ্বমঞ্চে যাচ্ছে বাংলাদেশ নারী দল।