আবাসন খাতে ১২০ কোটি টাকা আত্মসাৎ: হলিস্টিক হোমের ডিএমডি গ্রেপ্তার

আবাসন ব্যবসার আড়ালে কয়েকশ গ্রাহকের সঞ্চিত অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ‘হলিস্টিক হোম বিল্ডার্স লিমিটেড’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) হায়দার কবির মিথুনকে (৫৪) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। রোববার সিআইডি সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

গ্রেপ্তারের প্রেক্ষাপট ও প্রক্রিয়া

সিআইডি জানায়, গত শুক্রবার দিবাগত রাতে বিদেশ থেকে দেশে ফেরার সময় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশের সহায়তায় মিথুনকে গ্রেপ্তার করা হয়। উত্তরা-পূর্ব থানায় দায়ের করা একটি প্রতারণা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে এই অভিযান পরিচালিত হয়। মামলার পর থেকেই তিনি পলাতক ছিলেন এবং দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থেকে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন।

প্রতারণার কৌশল ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ

তদন্তকারী সংস্থা ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, হলিস্টিক হোম বিল্ডার্স লিমিটেড উত্তরখান এলাকায় ১০ কাঠা জমির ওপর একটি ৯ তলা আবাসিক ভবন নির্মাণের প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করে। প্রতিষ্ঠানটি ওই প্রকল্পে মোট ৩৬টি শেয়ার বিক্রির ঘোষণা দেয় এবং প্রতি শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করে ১৫ লাখ টাকা। এই প্রলোভনে পড়ে বহু সাধারণ মানুষ তাদের কষ্টার্জিত অর্থ প্রতিষ্ঠানের উত্তরা সেক্টর-৪-এর কার্যালয়ে জমা দেন।

এক ভুক্তভোগী গ্রাহক ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে প্রাথমিকভাবে ১ লাখ টাকা এবং পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে মোট ১২ লাখ ৮০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেন। একইভাবে তার এক পরিচিত ব্যক্তি আরও ৯ লাখ টাকা প্রদান করেন। অর্থ গ্রহণের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি মানি রিসিট ও সিকিউরিটি চেক প্রদান করলেও নির্ধারিত সময়ে জমি রেজিস্ট্রি বা ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেয়নি। পরবর্তীতে গ্রাহকরা অর্থ ফেরত চাইলে তাদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়।

জালিয়াতির পরিসংখ্যান ও আর্থিক বিবরণী

সিআইডির প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে যে, প্রতিষ্ঠানটি শুধুমাত্র উত্তরখান প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় থ্রি-স্টার মানের হোটেল এবং বিভিন্ন মৌজার জমির শেয়ার বিক্রির ভুয়া বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রায় ৪৭০ জন গ্রাহকের কাছ থেকে আনুমানিক ১২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

নিচে জালিয়াতি সংক্রান্ত তথ্যের একটি সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:

বিষয়বিস্তারিত তথ্য
প্রতিষ্ঠানের নামহলিস্টিক হোম বিল্ডার্স লিমিটেড
প্রধান অভিযুক্ত (গ্রেপ্তারকৃত)হায়দার কবির মিথুন (ডিএমডি)
প্রকল্পের ধরন৯ তলা ভবন (১০ কাঠা জমির ওপর) ও হোটেল শেয়ার
মোট ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকপ্রায় ৪৭০ জন
আত্মসাৎকৃত অর্থের পরিমাণপ্রায় ১২০ কোটি টাকা
শেয়ার প্রতি মূল্য (আবাসিক)১৫ লাখ টাকা
মামলার স্থানউত্তরা-পূর্ব ও উত্তরা-পশ্চিম থানা

প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা

তদন্তে আরও দেখা গেছে, গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাৎ করার পর প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. শিশির আহমেদ আত্মগোপনে চলে যান। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানে একটি নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়। আশ্চর্যজনকভাবে, এই নতুন পর্ষদ ঘোষণা দেয় যে, ২০২২ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংঘটিত কোনো আর্থিক লেনদেনের দায়ভার তারা গ্রহণ করবে না। এই ঘোষণা গ্রাহকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে।

সিআইডি জানায়, গ্রেপ্তারকৃত হায়দার কবির মিথুন ডিএমডি হিসেবে সরাসরি অর্থ সংগ্রহ ও আত্মসাতের প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে উত্তরা-পূর্ব ও উত্তরা-পশ্চিম থানায় একাধিক প্রতারণা মামলা রয়েছে এবং অনেকগুলোতে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। বর্তমানে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং এই চক্রের অন্যান্য সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।