দিনাজপুরের বোচাগঞ্জে সাপের কামড়ে আক্রান্ত এক নারীর মৃত্যু ঘিরে চিকিৎসা ব্যবস্থায় চরম অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিভেনম মজুত থাকলেও আইসিইউ সুবিধার অভাবে রোগীকে ভ্যাকসিন প্রদান করা হয়নি। পরবর্তীতে জেলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও শয্যা সংকটের কারণে চিকিৎসা পেতে বিলম্ব হওয়ায় ৫৪ বছর বয়সী জুলেখা খাতুনের মৃত্যু হয়েছে।
Table of Contents
ঘটনার বিবরণ ও প্রেক্ষাপট
গত শুক্রবার (৮ মে, ২০২৬) আনুমানিক দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার রনগাঁও ইউনিয়নের চণ্ডীপুর গ্রামের রফিকুল ইসলামের স্ত্রী জুলেখা খাতুন নিজ বাড়ির গোলাঘরে সাপের কামড়ের শিকার হন। তার চিৎকার শুনে স্বজনেরা এগিয়ে আসেন এবং তার বাম হাতের কবজি থেকে রক্ত ঝরতে দেখেন। তাৎক্ষণিকভাবে পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে এবং যে সাপটি তাকে দংশন করেছিল, সেটিকে ধরে নিয়ে বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছান।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভূমিকা
হাসপাতালে ভর্তির পর রোগীর রক্ত পরীক্ষা করা হয়। স্বজনদের দাবি অনুযায়ী, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বীকার করে যে তাদের কাছে অ্যান্টিভেনম মজুত রয়েছে। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরা জানান, ভ্যাকসিন দেওয়ার পরবর্তী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামাল দিতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ (ICU) সাপোর্টের প্রয়োজন হয়, যা ওই হাসপাতালে নেই। এই যুক্তিতে রোগীকে দ্রুত দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর (রেফার) করা হয়।
দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ ও মৃত্যু
বোচাগঞ্জ থেকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর সেখানেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ অনুযায়ী, জরুরি বিভাগে ভর্তির পর জানানো হয় আইসিইউ বেড খালি নেই। সেখানে চিকিৎসা শুরু করতে বিলম্ব হওয়ায় রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে শুরু করে। নিরুপায় হয়ে স্বজনরা তাকে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলে পথেই তার মৃত্যু হয়। বেসরকারি ‘চেকআপ স্পেশালাইজড হাসপাতাল’ এর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত কালপঞ্জি ও তথ্যচিত্র
| বিষয়ের বিবরণ | তথ্য ও সংশ্লিষ্টতা |
| ভিকটিমের নাম ও বয়স | জুলেখা খাতুন (৫৫) |
| ঘটনার স্থান ও সময় | চণ্ডীপুর গ্রাম, বোচাগঞ্জ; শুক্রবার দুপুর ১২:৩০ মিনিট |
| উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মজুত | ৪০ ভায়েল অ্যান্টিভেনম (এডিবির বরাদ্দসহ) |
| মৃত্যুর সময় | শুক্রবার দুপুর ২:১৫ মিনিট |
| মৃত্যুর প্রাথমিক কারণ | বিষক্রিয়া ও সময়মতো অ্যান্টিভেনম না পাওয়া |
| অভিযোগের ধরন | চিকিৎসায় অবহেলা ও রেফার জটিলতা |
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বিজয় কুমার রায় জানান, হাসপাতালে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম থাকা সত্ত্বেও আইসিইউ ব্যাকআপ না থাকায় তারা ঝুঁকি নিতে পারেননি। রক্ত পরীক্ষায় প্রাথমিকভাবে হেমোটক্সিক বা নিউরোটক্সিক সংক্রমণ ধরা না পড়লেও নিরাপত্তার স্বার্থেই রোগীকে রেফার করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, বোচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফ হাসান বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন। তিনি জানান, স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্প্রতি ২০ ভায়েল অ্যান্টিভেনম সরবরাহ করা হয়েছিল। পর্যাপ্ত ঔষধ থাকা সত্ত্বেও কেন রোগীকে তা দেওয়া হলো না, সে বিষয়ে তদন্ত করা হবে।
জেলা পর্যায়ে সাপে কাটার বর্তমান পরিস্থিতি
দিনাজপুর জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় অ্যান্টিভেনমের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তবে গত এক বছরে জেলায় সাপের কামড়ে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হলেও সঠিক পরিসংখ্যান সংরক্ষণে ঘাটতি দেখা গেছে। জেলা সিভিল সার্জন আসিফ ফেরদৌস জানিয়েছেন, বোচাগঞ্জের এই বিশেষ ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং হাসপাতালগুলোতে তথ্য সংরক্ষণের বিষয়টি জোরদার করা হবে।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয় এলাকাবাসীর দাবি, উপজেলা পর্যায়ে অ্যান্টিভেনম ব্যবহারের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জরুরি ক্ষেত্রে আইসিইউ সাপোর্ট নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে না। বর্তমানে জুলেখা খাতুনের পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং তার ছোট মেয়ে সুমী আক্তারসহ স্বজনরা এই অব্যবস্থাপনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন।
