কাপাসিয়ায় সপরিবারে ৫ জনকে নৃশংস হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের

নিজস্ব প্রতিবেদক: গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় একই পরিবারের পাঁচ সদস্যকে জবাই করে হত্যার পৈশাচিক ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। শনিবার (৯ মে ২০২৬) রাতে নিহত গৃহবধূর পিতা সাহাদত মোল্লা বাদী হয়ে কাপাসিয়া থানায় এই হত্যা মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় পলাতক ঘাতক স্বামী ফুরকান মিয়াকে প্রধান আসামি করার পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৪ থেকে ৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করছে।

হত্যাকাণ্ডের বিবরণ ও মরদেহ উদ্ধার

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা এলাকার একটি আবাসিক কলোনির ঘর থেকে শনিবার (৯ মে) সকালে একই পরিবারের পাঁচজনের রক্তমাখা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মর্মান্তিক এই হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিরা হলেন— অভিযুক্ত ফুরকান মিয়ার স্ত্রী শারমিন বেগম (৩২), তাঁর ছোট ভাই ও ফুরকানের শ্যালক রসুল মিয়া (২২) এবং ফুরকানের তিন কন্যা সন্তান যথাক্রমে মীম (১৪), হাবিবা (১০) ও শিশু ফারিয়া (২)।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নিহতদের পরিবারটি মূলত গোপালগঞ্জ জেলা শহরের স্থায়ী বাসিন্দা। জীবিকার তাগিদে তাঁরা গাজীপুরের কাপাসিয়ায় এসে একটি কলোনিতে ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেছিলেন। শুক্রবার (৮ মে) গভীর রাতের কোনো এক সময় ঘাতক অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ঘুমন্ত অবস্থায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে পাঁচজনকে জবাই করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। শনিবার ভোরে প্রতিবেশীরা রক্তাক্ত অবস্থা দেখে পুলিশে খবর দিলে কাপাসিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণ করে।

হত্যাকাণ্ড পরবর্তী ঘটনা ও পলাতক স্বামী

নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই অভিযুক্ত ঘাতক ফুরকান মিয়া এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। পুলিশ জানিয়েছে, ঘাতক অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় এই অপরাধ সংঘটন করেছে। হত্যার পর শনিবার ভোরে সে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় নিহত শারমিনের স্বজনদের কাছে মোবাইল ফোনে কল করে এই খুনের কথা স্বীকার করে। ঘাতকের এই স্বীকারোক্তির পর স্বজনদের মাঝে আহাজারি শুরু হয় এবং পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কালিগঞ্জ সার্কেল) মো. আসাদুজ্জামান মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নিহতের পিতা সাহাদত মোল্লা বাদী হয়ে ফুরকানকে এক নম্বর আসামি করে এজাহার দাখিল করেছেন। ঘটনার নেপথ্যে অন্য কারো প্ররোচনা বা সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে অজ্ঞাত ৪-৫ জনকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তদন্ত ও আইনি কার্যক্রমের অগ্রগতি

একই পরিবারের পাঁচজনকে হত্যার এই ঘটনায় কাপাসিয়া উপজেলাসহ পুরো জেলায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে এবং অপরাধে ব্যবহৃত অস্ত্রের সন্ধানে তল্লাশি চালাচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, পারিবারিক কলহ বা কোনো গভীর আক্রোশের জেরে এই ঘটনা ঘটতে পারে। তবে মামলার এজাহারে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা না হলেও ফুরকানের মানসিক অবস্থা ও পূর্ববর্তী আচরণের দিকে নজর দিচ্ছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

গাজীপুর জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কালিগঞ্জ সার্কেল) আসাদুজ্জামান আরও জানান, ঘাতক ফুরকানকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের একাধিক দল বিভিন্ন স্থানে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় তাঁর অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। একই কলোনির অন্যান্য বাসিন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে হত্যার সময়কার কোনো শব্দ বা সন্দেহজনক গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হচ্ছে।

শোকের ছায়া ও ন্যায়বিচারের দাবি

নিহত রসুল মিয়া ও শারমিন বেগমের পরিবারের সদস্যরা শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন। জীবিকার সন্ধানে আসা এই হতভাগ্য পরিবারটির এমন করুণ পরিণতিতে পুরো রাউৎকোনা এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নিহতের বাবা সাহাদত মোল্লা কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, যে ঘাতক নিজের সন্তানদেরও রেহাই দেয়নি, তাঁর যেন দ্রুততম সময়ে বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি বিরল ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড, যেখানে একই পরিবারের নিরপরাধ শিশুসহ পাঁচজনকে নির্মূল করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তারা বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে এবং খুব দ্রুতই আসামিদের আইনের আওতায় এনে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। মরদেহগুলোর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে মৃত্যুর ধরন ও সময় সম্পর্কে আরও নিখুঁত ধারণা পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে কাপাসিয়া থানায় মামলাটি নথিভুক্ত হওয়ার পর পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া ও তদন্ত ত্বরান্বিত করা হয়েছে।