দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলা: গোলানি ব্রিগেডের তরুণ ইসরায়েলি সেনা নিহত

দক্ষিণ লেবাননের কান্তারা গ্রামে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর একটি বিস্ফোরকবাহী ড্রোন (কামিকাজে ড্রোন) হামলায় সার্জেন্ট লিয়েম বেন হামো নামে ১৯ বছর বয়সী এক ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন। ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার সকালে সংঘটিত এই হামলায় আরও একজন সেনা সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। এই ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাতের তীব্রতাকে নতুন করে উসকে দিয়েছে।


ঘটনার বিস্তারিত ও নিহতের পরিচয়

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিহত সার্জেন্ট লিয়েম বেন হামো গোলানি ব্রিগেডের ১৩ নম্বর ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন। ১৯ বছর বয়সী এই তরুণ সেনা দক্ষিণ লেবাননে মোতায়েনকৃত একটি সামরিক ইউনিটের অংশ ছিলেন।

বৃহস্পতিবার ভোরে হিজবুল্লাহ দক্ষিণ লেবাননের কান্তারা গ্রাম অভিমুখে দুটি বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোন নিক্ষেপ করে। আইডিএফ-এর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি ড্রোন মাঝপথেই ধ্বংস করতে সক্ষম হলেও দ্বিতীয় ড্রোনটি শনাক্তকরণ এড়িয়ে গোলানি ব্রিগেডের অবস্থান লক্ষ্য করে আঘাত হানে। ড্রোনটি সেনাদের খুব কাছে বিস্ফোরিত হওয়ায় সার্জেন্ট লিয়েম বেন হামো ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান এবং গুরুতর আহত অবস্থায় অপর এক সেনাকে হেলিকপ্টার যোগে সামরিক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।


হিজবুল্লাহর দায় স্বীকার ও হামলার উদ্দেশ্য

সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এই হামলার দায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে বিবৃতি প্রদান করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, কান্তারা গ্রামে অবস্থানরত ইসরায়েলি বাহিনীর দুটি ‘মারকাভা’ ট্যাংক লক্ষ্য করে এই ড্রোনগুলো পরিচালিত হয়েছিল। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইসরায়েলি সেনারা যুদ্ধবিরতির নীতিমালা লঙ্ঘন করে লেবাননের সীমানার ভেতরে অবস্থান করছে এবং ড্রোন হামলাটি ছিল তারই পাল্টা জবাব। আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইসরায়েলি সাঁজোয়া যান ও পদাতিক বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করাই ছিল এই অভিযানের মূল লক্ষ্য।


আঞ্চলিক উত্তাপ ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

এই সংঘাতের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযানের পর ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়। সেই সময় থেকেই হিজবুল্লাহ ইরানের মিত্র হিসেবে এই লড়াইয়ে যুক্ত রয়েছে।

বর্তমানে দুই পক্ষের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা থাকলেও বাস্তবে নিয়মিত বিরতিতে হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটছে। হিজবুল্লাহর মতে, দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন কৌশলগত পয়েন্ট থেকে ইসরায়েল তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করেনি এবং নিয়মিতভাবে লেবাননের আকাশসীমা লঙ্ঘন করছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল দাবি করছে যে হিজবুল্লাহ সীমান্তে যুদ্ধের প্রস্তুতি পুনরায় শুরু করেছে। এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মাঝেই ড্রোন ও রকেট ব্যবহারের মাধ্যমে সীমান্ত অঞ্চলে একটি যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে।


মার্কিন প্রশাসন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা

ইসরায়েলের বর্তমান প্রশাসন লেবাননের অভ্যন্তরে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে পুনরায় একটি পূর্ণাঙ্গ স্থল অভিযান (Full-scale invasion) শুরু করার পরিকল্পনা করলেও এতে বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সবুজ সংকেত পাওয়া যায়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে সরাসরি জড়াতে বা বড় কোনো সামরিক অভিযানের অনুমোদন দিতে এই মুহূর্তে আগ্রহী নন। ট্রাম্প প্রশাসনের এই সংঘাত এড়ানোর কৌশলের কারণে ইসরায়েলি বাহিনী মূলত আকাশপথে হামলা এবং ড্রোন বিধ্বংসী ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। তবে বৃহস্পতিবারের এই প্রাণহানি ইসরায়েলের অভ্যন্তরে জনমতকে যুদ্ধের পক্ষে আরও কঠোর করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।


পাল্টা অভিযান ও বর্তমান উত্তেজনা

ড্রোন হামলার ঘটনার পরপরই কান্তারা গ্রামসহ আশপাশের হিজবুল্লাহর অবস্থানগুলো লক্ষ্য করে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী ও কামানের গোলাবর্ষণ শুরু হয়েছে। আইডিএফ জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর ড্রোন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ও পর্যবেক্ষণ পোস্টগুলো ধ্বংস করাই তাদের এই পাল্টা আক্রমণের মূল লক্ষ্য।

টাইমস অব ইসরায়েলের তথ্যমতে, সার্জেন্ট লিয়েম বেন হামোর মৃত্যুর ঘটনায় ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। গোলানি ব্রিগেডের অবস্থানগুলো সুরক্ষায় নতুন জ্যামার ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম মোতায়েন করা হচ্ছে। দক্ষিণ লেবাননের সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে, কারণ এ ধরণের বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ যেকোনো মুহূর্তে একটি নিয়ন্ত্রনহীন আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপান্তরিত হতে পারে।